দক্ষিণ ভারতের “গড’স ওন কান্ট্রি” কেরালার প্রতিটি কোণেই যেন প্রকৃতির এক নতুন রূপ উন্মোচিত হয়। সেই কেরালারই পাহাড়-অরণ্যে জড়ানো এক বিস্ময়কর জায়গা — তেক্কাডি (Thekkady)। এটি শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি এক জীবন্ত অরণ্য, এক নিঃশব্দ সৌন্দর্যের রাজ্য, যেখানে প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী ও নীরবতা মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে অনন্য এক জগৎ।
🌲 কোথায় অবস্থিত তেক্কাডি
তেক্কাডি কেরালার ইদুক্কি জেলার অন্তর্গত একটি পাহাড়ি অঞ্চল। এটি বিখ্যাত পেরিয়ার বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (Periyar Wildlife Sanctuary)-এর জন্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯০০–১৮০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই বনাঞ্চল কেরালার অন্যতম বৃহৎ সংরক্ষিত এলাকা। কোচি বা কোট্টায়াম থেকে গাড়িতে প্রায় ৪–৫ ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায় এই মনোমুগ্ধকর স্থানে।
🌿 পেরিয়ার ন্যাশনাল পার্ক — তেক্কাডির প্রাণ
তেক্কাডির আসল আকর্ষণ নিঃসন্দেহে পেরিয়ার লেক ও ন্যাশনাল পার্ক। ৭৭৭ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্যটি ১৮৯৫ সালে ব্রিটিশ আমলে একটি বাঁধ নির্মাণের পর গঠিত হয়। আজ এটি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঘ সংরক্ষণ এলাকা (Tiger Reserve) হিসেবেও খ্যাত।
এখানে নৌকায় চেপে ঘুরে বেড়ানো এক অনন্য অভিজ্ঞতা — নৌকার দু’পাশে সবুজ অরণ্য, মাঝেমাঝে দেখা যায় বন্য হাতির পাল, হরিণ, গাউর, ময়ূর বা এমনকি কুমিরও! সকালে বা বিকেলের আলোয় পেরিয়ার লেকের জলে সূর্যের প্রতিফলন যেন ছবির মতো লাগে।
🐘 বন্যপ্রাণীর রাজ্য
তেক্কাডিতে প্রকৃতিপ্রেমীরা উপভোগ করতে পারেন বিরল বন্যপ্রাণীর দর্শন —
- হাতি (Elephant)
- বাঘ (Tiger, যদিও দেখা দুর্লভ)
- নিলগিরি লাংগুর
- সম্বর হরিণ, চিতা, গাউর, এবং নানা প্রজাতির পাখি ও প্রজাপতি।
যারা অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী, তারা অংশ নিতে পারেন জঙ্গল ট্রেকিং, বাঁশের ভেলা চালানো (Bamboo Rafting) বা জীপ সাফারি-র মতো কার্যক্রমে।
🌸 মসলা চাষের সুবাস
তেক্কাডি শুধু বন বা লেক নয় — এটি কেরালার বিখ্যাত স্পাইস ভ্যালি। এখানে ছড়িয়ে রয়েছে এলাচ, গোলমরিচ, দারচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল ও কফির বাগান।
স্থানীয় গাইড নিয়ে এই বাগানগুলিতে হাঁটলে গাছ থেকে সরাসরি সুগন্ধি মসলার গন্ধে ভরে ওঠে মন। অনেক দোকানে এই তাজা মসলা বিক্রিও হয়, যা পর্যটকদের জন্য এক অমূল্য সংগ্রহ।
🏞️ অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
তেক্কাডি ভ্রমণের সময় দেখা যায় আরও কিছু মনোরম স্থান—
- মুরুকারা ও কুরিসুমালা ট্রেকিং পয়েন্ট – পাহাড়চূড়ায় উঠে দেখা যায় বিস্তীর্ণ সবুজ উপত্যকা।
- চেল্লারকোভিল ভিউ পয়েন্ট – এখান থেকে তামিলনাড়ুর প্রান্তর পর্যন্ত দেখা যায়।
- পান্ডিকুজি – পিকনিকের জন্য আদর্শ স্থান, জলের ধারা আর ঘন অরণ্য যেন স্বপ্নের মতো।
- কাদাথানাডু কালারি সেন্টার – যেখানে দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী কালারিপায়াট্টু মার্শাল আর্ট প্রদর্শন।
🏡 থাকার ব্যবস্থা
তেক্কাডিতে রয়েছে নানা ধরনের রিসর্ট ও হোটেল — অরণ্যের মধ্যে ইকো-রিসর্ট, ট্রিহাউস থেকে শুরু করে বিলাসবহুল হোটেল পর্যন্ত।
রাতের অরণ্যের নিস্তব্ধতায় কেবল পোকামাকড়ের আওয়াজ, দূরে কোথাও হাতির ডাক — এই অভিজ্ঞতা আজীবন মনে থেকে যায়।
🍛 তেক্কাডির খাবার
কেরালার স্বাদে ভরা খাবার এখানে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। আপ্পাম, পুট্টু, কেরালা পরোটা, ফিশ কারি, পেপার চিকেন, আর নারকেলের দুধে রান্না করা ভেজ মেনু— সব কিছুই অনন্য স্বাদের।
✨ উপসংহার
তেক্কাডি শুধু একটি ভ্রমণস্থান নয়, এটি এক অন্তর্জগতের যাত্রা। এখানে এসে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে যায়, শহরের কোলাহল হারিয়ে গিয়ে খুঁজে পায় নিজের ভিতরের শান্তি। পেরিয়ারের জল, অরণ্যের গন্ধ, হাতির গর্জন, আর মসলার সুবাস— সব মিলে তেক্কাডি যেন এক জীবন্ত কবিতা।
📍সংক্ষিপ্ত তথ্য:
- অবস্থান: ইদুক্কি জেলা, কেরালা
- দূরত্ব: কোচি থেকে প্রায় ১৫০ কিমি
- দেখার সেরা সময়: সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ
- বিশেষ আকর্ষণ: পেরিয়ার লেক সাফারি, বন্যপ্রাণী দর্শন, স্পাইস ট্যুর












Leave a Reply