দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্য প্রকৃতির রঙে রঙিন এক অনন্য ভূমি। আর এই রাজ্যের অন্যতম রত্ন হলো পেরিয়ার টাইগার রিজার্ভ (Periyar Tiger Reserve)—যেখানে পাহাড়, বন, নদী ও বন্যপ্রাণের মিলনে তৈরি হয়েছে এক অপূর্ব জগত। এখানে এসে মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সৃষ্টি করেছে এক জীবন্ত চিত্রকর্ম।
🌿 প্রকৃতির বুকে পেরিয়ার টাইগার রিজার্ভ
কেরালার ইদুক্কি ও পাত্তনামথিট্টা জেলা জুড়ে প্রায় ৯২৫ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই সংরক্ষিত বনভূমি ভারতের অন্যতম প্রাচীন বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ঢাল বেয়ে নেমে আসা নদী, হ্রদ ও ঘন শাল-মহুয়া বনে ঘেরা এই অঞ্চল যেন এক প্রাণবন্ত সবুজ সাম্রাজ্য।
এই রিজার্ভের কেন্দ্রবিন্দু হল পেরিয়ার হ্রদ (Periyar Lake), যা আসলে ১৮৯৫ সালে তৈরি একটি কৃত্রিম হ্রদ। তবে প্রকৃতির সৌন্দর্যে এটি এতটাই মনোহর যে মনে হয় এটি প্রকৃতিরই সৃষ্টি। এই হ্রদের উপর নৌকাভ্রমণ পেরিয়ারের প্রধান আকর্ষণ। নৌকা ভ্রমণের সময় হঠাৎই চোখে পড়ে হরিণের দল, হাতির পাল, বা দূরে জলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক রাজসিক বাঘ।
🐅 বন্যপ্রাণের স্বর্গরাজ্য
পেরিয়ার টাইগার রিজার্ভ ভারতের ৫০টি বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম। এখানে প্রায় ৪০-৫০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার বসবাস করে। তবে শুধুই বাঘ নয়—এখানে রয়েছে ভারতীয় হাতি, গাউর (Indian Bison), চিতাবাঘ, বুনো শুয়োর, সাম্বার হরিণ, ও ম্যালাবার দৈত্য কাঠবিড়ালি প্রভৃতি নানা প্রাণী।
এছাড়া এখানে রয়েছে প্রায় ২৬৬ প্রজাতির পাখি, যেমন মালাবার হর্নবিল, ব্রাহ্মিনী ঈগল, গ্রে-হেডেড ফিশ ঈগল, ও ময়ূর। প্রজাপতি ও সরীসৃপের সংখ্যাও বিস্ময়কর—যা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
🌳 ইকো-ট্যুরিজম ও দর্শনীয় কার্যক্রম
পেরিয়ারে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হলো ইকো-ট্যুরিজম কার্যক্রম, যা স্থানীয় জনগণ ও বনবিভাগের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে কিছু জনপ্রিয় অভিজ্ঞতা হলো—
- বোট সাফারি: পেরিয়ার হ্রদে নৌকায় ভ্রমণ, যেখানে বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।
- বাঁশের ভেলায় ভ্রমণ (Bamboo Rafting): নিরিবিলি জলের ওপর ভেসে থাকার এই অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য।
- নেচার ওয়াক: গাইডের সঙ্গে বনের ভেতর পদচারণা করে ঘন সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়া।
- নাইট ট্রেকিং: সাহসীদের জন্য রাতের বনে বন্যপ্রাণের আওয়াজে ভরা এক রহস্যময় অভিযান।
- এলিফ্যান্ট ক্যাম্প ভিজিট: যেখানে হাতিদের খাবার দেওয়া ও তাদের প্রাকৃতিক আচরণ দেখা যায়।
🧭 কীভাবে যাবেন
- বিমানপথে: নিকটতম বিমানবন্দর মাদুরাই (প্রায় ১৪০ কিমি) বা কোচি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (প্রায় ১৯০ কিমি)।
- রেলপথে: নিকটতম রেলস্টেশন কুম্বম (Kottayam) বা চাঙ্গানাসেরি, সেখান থেকে ট্যাক্সি বা বাসে পৌঁছানো যায়।
- সড়কপথে: কেরালার বিখ্যাত হিল স্টেশন থেক্কাডি (Thekkady) থেকে পেরিয়ার টাইগার রিজার্ভ মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে।
🌦️ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ হলো পেরিয়ার ভ্রমণের সেরা সময়। এই সময়ে আবহাওয়া মনোরম, আর বনের প্রাণিকূল সক্রিয় থাকে। বর্ষাকালে (জুন-সেপ্টেম্বর) বন আরও সবুজ ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যদিও বৃষ্টিপাতের কারণে কিছু কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
🏡 থাকার ব্যবস্থা
থেক্কাডির আশেপাশে অসংখ্য রিসর্ট, বনবাংলো ও ইকো-কটেজ রয়েছে। এর মধ্যে পেরিয়ার লেক প্যালেস, আরণ্য নিয়াস গেস্ট হাউস ও উডল্যান্ড রিসর্ট জনপ্রিয়। কিছু রিসর্ট থেকে সরাসরি হ্রদের দৃশ্য দেখা যায়, যা ভ্রমণকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে।
🌺 উপসংহার
কেরালার পেরিয়ার টাইগার রিজার্ভ শুধুমাত্র একটি বনাঞ্চল নয়—এটি প্রকৃতি, প্রাণী ও মানুষের সহাবস্থানের এক জীবন্ত উদাহরণ। এখানে এসে বোঝা যায়, প্রকৃতির সঙ্গে শান্তি ও সম্মিলনের আসল মানে কী।
যখন সকালে কুয়াশার আড়াল থেকে সূর্যের আলো হ্রদের জলে পড়ে, তখন দূর থেকে ভেসে আসে হাতির ডাক—মনে হয় পৃথিবীর সব শান্তি যেন এই বনেই লুকিয়ে আছে।
পেরিয়ার সেই বন, যেখানে জীবনের ছন্দ মিশে আছে প্রকৃতির নিঃশ্বাসে। 🌿🐘












Leave a Reply