বাঁকুড়া, আবদুল হাই:- আজ সোনামুখী উত্তর চক্রের অন্তর্গত মদনপুর জয়নগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল দেশপ্রেমের সুরে। ‘বন্দেমাতরম’ গানের সার্ধশততম অর্থাৎ ১৫০তম বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয় এক বিশেষ অনুষ্ঠান। সকালে ছাত্রছাত্রীরা হাতে পতাকা নিয়ে ‘বন্দেমাতরম’ গাইতে গাইতে সমগ্র গ্রাম পরিক্রমা করে। দেশপ্রেমের সেই আবহে ভরে ওঠে গোটা এলাকা।
বিদ্যালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, যেখানে শিক্ষকবৃন্দ ‘বন্দেমাতরম’ গানের ইতিহাস, এর স্রষ্টা সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ও দেশপ্রেমের ভাবনা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। বিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও ‘বন্দেমাতরম’ গানের তালে এক মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশন করে, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে তোলে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ই নভেম্বর বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় এই অমর গানটি। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হুগলি জেলার চুঁচুড়ায়, হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত আদ্ধা পরিবারে বসেই সংস্কৃত ভাষায় বাংলা হরফে এই গানটি রচনা করেছিলেন। পরে ১৮৮২ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ-এ ‘বন্দেমাতরম’ গানটি সংযোজিত হয়।
এই গানটি মোট ২৭টি পংক্তিতে রচিত হলেও, এর মধ্যে ১২টি লাইন জাতীয় স্তোত্র বা ন্যাশনাল সং হিসেবে স্বীকৃত। ১৯০৯ সালে শ্রী অরবিন্দ এই গানটির ইংরেজি অনুবাদ করেন—“Mother, I bow to thee” নামে। গানটির সুরকার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগীতগুরু এবং বঙ্কিমচন্দ্রের শিক্ষাগুরু, বিষ্ণুপুরের খ্যাতনামা সংগীতজ্ঞ যদুনাথ ভট্টাচার্য, যিনি ‘যদুভট্ট’ নামে সুপরিচিত।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনন্দময় ঘোষ বলেন, “এই গান আমাদের জাতীয় চেতনা ও স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। আমরা গর্বিত যে এর স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আমাদের এই বাংলার সন্তান।”
উল্লেখযোগ্য যে, ১৯০৫ সালে দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা হীরালাল সেন ‘বন্দেমাতরম’কে কেন্দ্র করে প্রথম একটি সিনেমা নির্মাণ করেন। আবার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই গানটির আহ্বানে প্রথম শহিদ হন এক বাঙালি নারী—মাতঙ্গিনী হাজরা।
এই বিশেষ বর্ষে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, সারাবছরই প্রতিদিন প্রার্থনাসভায় ‘বন্দেমাতরম’ গানটি গাওয়া হবে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা ছোটবেলা থেকেই দেশের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়।
এইভাবেই দেশপ্রেমের প্রতীক ‘বন্দেমাতরম’ আজও অনুরণিত করে চলেছে প্রতিটি ভারতবাসীর হৃদয়।












Leave a Reply