নিজস্ব সংবাদদাতা, বালুরঘাট:- ভাষাই যখন অপরাধের একমাত্র প্রমাণ—তখন নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার ও নথিপত্র সবই অর্থহীন হয়ে পড়ে। মহারাষ্ট্রের বিজেপি-শাসিত এলাকায় ঠিক এই ভয়াবহ বাস্তবতারই শিকার হলেন পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার দুই বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক। শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দিয়ে প্রায় ছ’মাস জেলে আটকে রাখা হল—যদিও দু’জনেই নথিভুক্ত ভারতীয় ভোটার।
বালুরঘাট ব্লকের লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা অসিত সরকার (৫৪) এবং গঙ্গারামপুর ব্লকের পুলিন্দা গ্রামের গৌতম বর্মণ (৪২) চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মুম্বই সংলগ্ন ভিওয়ান্ডিতে গ্রেপ্তার হন। অভিযোগ, ভাষাগত প্রোফাইলিংয়ের ভিত্তিতে মহারাষ্ট্র পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে বিদেশি আইন প্রয়োগ করে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে—একমাত্র কারণ, তাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলতেন।
পরবর্তী প্রায় ছ’মাস ধরে থানে জেলে বন্দি অবস্থায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে কাটে তাঁদের দিন। এদিকে পরিবারগুলি একের পর এক প্রশাসনিক দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনও সুরাহা পাননি। নাগরিকত্বের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ভাষার ভিত্তিতে কারাবাস—এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলে দিল ভারতীয় গণতন্ত্রে নাগরিক অধিকারের বাস্তব নিরাপত্তা নিয়ে।
পরিবারগুলির দাবি, তাঁরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও স্থানীয় সাংসদ ডা. সুকান্ত মজুমদারের কাছেও বারবার সাহায্যের আবেদন জানান। কিন্তু অভিযোগ, সাংসদের তরফে কোনও সাড়া মেলেনি।
শেষ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের হস্তক্ষেপে আইনি লড়াইয়ের পথ খুলে যায়। রাজ্যসভার সাংসদ তথা পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের চেয়ারম্যান সামিরুল ইসলাম-সহ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টিতে সক্রিয় হন। আদালতে জমি সংক্রান্ত নথি, পরিচয়পত্র ও বাসস্থানের প্রমাণ পেশ করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল—অসিত সরকার ও গৌতম বর্মণের নাম খসড়া ভোটার তালিকায় (SIR) অন্তর্ভুক্ত, যা তাঁদের ভারতীয় ভোটার হওয়ার অকাট্য প্রমাণ।
সব তথ্য খতিয়ে দেখে চলতি বছরের নভেম্বর মাসে আদালত তাঁদের অন্তর্বর্তী জামিন মঞ্জুর করে।
শনিবার দুই শ্রমিককে মহারাষ্ট্র থেকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়। রবিবার সন্ধ্যায় তাঁরা তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তাঁদের পূর্ণ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার আশ্বাস দেন। দীর্ঘ ছ’মাসের অন্যায় কারাবাসের পর নিজ রাজ্যে ফিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন দুই শ্রমিক।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি অম্বরীশ সরকার তাঁদের কলকাতা থেকে নিজ নিজ গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। সোমবার তাঁদের বাড়িতে পৌঁছনোর কথা।
ঘটনাটিতে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসার পর। তৃণমূল নেত্রী অপরূপা পোদ্দারের দাবি অনুযায়ী, গৌতম বর্মণ নিজেই বিজেপির বুথ সভাপতি। তবুও গ্রেপ্তারের পর তাঁর স্ত্রীর একাধিক আবেদন সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কোনও ভূমিকা দেখা যায়নি—যা তৃণমূল নেতৃত্বের ভাষায় ‘নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত’।
দুই শ্রমিকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে বলেন,
“বিজেপি-শাসিত রাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বলাই যেন অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ছ’মাসে হাজার হাজার মানুষ হেনস্তার শিকার হয়েছেন। গঙ্গারামপুর ও বালুরঘাটের দু’জনকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে মহারাষ্ট্রের জেলে পুরে দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের সাংসদ দিল্লির কাছে নতজানু হয়ে নিজের এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াননি।”
এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে বিজেপির দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক বাপি সরকার দাবি করেছেন, মন্ত্রীর হস্তক্ষেপেই জামিন সম্ভব হয়েছে—যা পরিবার ও তৃণমূল নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন।
এই ঘটনা নতুন করে অভিযোগ উসকে দিয়েছে যে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে পরিকল্পিতভাবে বাঙালি ভাষাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের টার্গেট করা হচ্ছে, অপমানিত ও অপরাধী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ব্যক্তিগত দুর্ভোগের ঊর্ধ্বে উঠে এই ঘটনা এক গভীর প্রশ্ন ছুড়ে দেয় ভারতের গণতন্ত্রের দিকে—
যখন নথিভুক্ত ভোটারও শুধুমাত্র মাতৃভাষার কারণে ‘বিদেশি’ হয়ে জেলে যান, তখন বার্তাটা স্পষ্ট:
ভোট গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু শুধু তখনই, যখন আপনার ভাষা ও পরিচয় শাসকের
নথিভুক্ত ভোটার হয়েও কারাবাস—মহারাষ্ট্রে ভাষাগত প্রোফাইলিংয়ের শিকার দক্ষিণ দিনাজপুরের শ্রমিকরা।












Leave a Reply