‘জল নামতেই নেতারাও নেমে গেছেন’—ধূপগুড়িতে প্রশাসনিক ব্যর্থতার নগ্ন ছবি।

ধুপগুড়ি, নিজস্ব সংবাদদাতা:- বন্যার জলে ভেসে গিয়েছিল ঘরবাড়ি। আর সেই জল নামার সঙ্গে সঙ্গেই এলাকা থেকে কার্যত উধাও হয়ে গিয়েছেন এলাকার জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তারা। ক্যালেন্ডারের পাতা চার মাস উল্টে গেলেও জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের গাধেয়ারখুঁটি ও হোগলাপাতা এলাকার বানভাসিদের জীবনে ফেরেনি স্বাভাবিক ছন্দ। আজও শতাধিক পরিবার প্লাস্টিকের তাঁবুর নিচে মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য—এ যেন প্রশাসনিক ব্যর্থতার নগ্ন দলিল।
বন্যার সময় এলাকায় নেতা-নেত্রীদের গাড়ির সারি, ক্যামেরার ঝলকানি আর ত্রাণ বিতরণের নামে সেলফি তোলার হিড়িকে তৈরি হয়েছিল উৎসবের মতো পরিবেশ। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে দায়িত্ব পালনের ঢাক পেটানো হয়েছিল। কিন্তু বন্যার জল নামতেই সেই সব নেতা-মন্ত্রী ও এলাকার বিধায়কের আর দেখা মেলেনি। স্থানীয়দের তীব্র কটাক্ষ,
“জল নামতেই নেতারাও নেমে গেছেন—আমরা পড়ে আছি গর্তে।”
এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বন্যায় শুধু ঘরবাড়ি ভাঙেনি—মুছে গেছে মানুষের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও। বসতভিটা আজ দীঘির মতো গভীর গর্তে পরিণত। একাধিক জায়গায় নদীর মতো খাদ তৈরি হওয়ায় সেখানে ঘর তোলা তো দূরের কথা, পা রাখাও ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ চার মাস কেটে গেলেও সেই গর্ত ভরাটে কোনও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিরা।

রাজ্য সরকারের তরফে আবাসনের জন্য মাথাপিছু ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের দাবি। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভিটে যখন গর্তে ভরা, তখন ঘর বানানোর প্রশ্নই ওঠে না। ফলে সেই ‘আবাসনের টাকা’ এখন রূপ নিয়েছে পেটের ভাতের টাকায়।
এক বন্যা দুর্গত মহিলার ক্ষোভে প্রশাসনের মুখোশ খুলে যায়—
“ঘর বানানোর টাকা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ঘর বানানোর জায়গাটাই তো নেই। আগে বাঁচব, না ঘর বানাব?”
দুর্গতদের অভিযোগ, বন্যার পর প্রশাসনিক আধিকারিক থেকে শুরু করে এলাকার বিধায়ক—সকলেই একের পর এক আশ্বাস দিয়েছেন। নদীর বাঁধ মেরামত, বসতভিটার গর্ত ভরাট—সবই প্রতিশ্রুতির তালিকায় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বাঁধের কাজ আজও শুরু হয়নি। আশ্বাস আছে, কাজ নেই—এটাই এখন ধূপগুড়ির বাস্তবতা।
বর্ষা আবার দরজায় কড়া নাড়ছে। অথচ প্লাস্টিকের তাঁবু, ভাঙা বাঁধ আর গর্তে ভরা ভিটে নিয়েই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বানভাসিরা। প্রশ্ন উঠছে—ত্রাণের সময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোই কি রাজ্য সরকার ও এলাকার বিধায়কের দায়িত্ব শেষ করে দেয়? নাকি এই মানুষগুলো শুধুই বিপর্যয়ের সময় ব্যবহৃত হওয়ার মতো মুখ, যাদের দুর্দশা দুর্যোগ কাটলেই ভুলে যাওয়া যায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *