যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ ভারত।

ভূমিকা:- কোনো জাতির প্রকৃত শক্তি তার যুবসমাজ। ইতিহাস সাক্ষী—যে দেশ তার তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পেরেছে, সেই দেশই অগ্রগতির শিখরে পৌঁছেছে। ভারতবর্ষ আজ বিশ্বের বৃহত্তম যুবসমৃদ্ধ দেশ। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের বেশি মানুষ ৩৫ বছরের নিচে। এই বিশাল যুবশক্তিই ভবিষ্যৎ ভারতের ভিত্তি। কিন্তু এই শক্তি আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ হবে, তা নির্ভর করছে যুবসমাজকে কীভাবে শিক্ষা, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধে গড়ে তোলা হচ্ছে তার উপর।
যুবসমাজের ধারণা ও বৈশিষ্ট্য:-
যুবসমাজ বলতে সাধারণত ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়। এই সময় মানুষের জীবনে থাকে অদম্য শক্তি, স্বপ্ন দেখার সাহস, নতুন কিছু করার প্রবল ইচ্ছা ও পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। যুবসমাজ কেবল বয়সের একটি ধাপ নয়; এটি এক ধরনের মানসিক অবস্থা—যেখানে চিন্তায় থাকে গতিশীলতা, মননে থাকে বিদ্রোহ এবং কর্মে থাকে উদ্যম।
ভারতের যুবসমাজ আজ প্রযুক্তিতে দক্ষ, বিশ্বজনীন চিন্তাধারায় অভ্যস্ত এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। এই বৈশিষ্ট্যই ভবিষ্যৎ ভারতের চালিকাশক্তি।
ইতিহাসে যুবসমাজের ভূমিকা:-
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যুবসমাজের অবদান অনস্বীকার্য। ক্ষুদিরাম বসু, ভগৎ সিং, সূর্য সেন, মাতঙ্গিনী হাজরা—এঁরা সকলেই ছিলেন তরুণ, যাঁদের রক্তে ছিল দেশপ্রেমের আগুন। গান্ধিজির ডাকে অসহযোগ আন্দোলন হোক বা নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ—প্রতিটি আন্দোলনের মেরুদণ্ড ছিল যুবসমাজ।
শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, সমাজ সংস্কারেও যুবসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সতীদাহ প্রথা রদ, নারীশিক্ষার প্রসার, জাতপাতের বিরুদ্ধে লড়াই—সব ক্ষেত্রেই তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ভারতের সমাজব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়েছে।
বর্তমান যুবসমাজের অবস্থা:-
বর্তমান ভারতের যুবসমাজ একদিকে যেমন সুযোগের সম্মুখীন, তেমনই নানা সমস্যায় জর্জরিত।
ইতিবাচক দিক
প্রযুক্তিগত দক্ষতা – ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্টার্টআপ সংস্কৃতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফ্রিল্যান্সিং—এই সব ক্ষেত্রে ভারতীয় যুবসমাজ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে।
শিক্ষা ও সচেতনতা – উচ্চশিক্ষার প্রসার, অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম এবং বিশ্বমানের শিক্ষার সুযোগ যুবসমাজকে আরও দক্ষ করে তুলছে।
উদ্যোক্তা মানসিকতা – চাকরির পিছনে না ছুটে অনেক তরুণ আজ নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তুলছে, যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
নেতিবাচক দিক
বেকারত্ব – শিক্ষিত বেকারত্ব আজ যুবসমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
নেশা ও আসক্তি – মাদক, অ্যালকোহল, মোবাইল ও গেমিং আসক্তি যুবসমাজের মননশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মূল্যবোধের অবক্ষয় – ভোগবাদী সংস্কৃতি ও দ্রুত সফল হওয়ার মানসিকতা নৈতিকতাকে দুর্বল করছে।
শিক্ষা ও যুবসমাজ:-
শিক্ষাই যুবসমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি। কিন্তু শুধু ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন মানবিক শিক্ষা। চরিত্র গঠন, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, সহনশীলতা—এই গুণগুলি শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে যুবসমাজের মধ্যে সঞ্চারিত করা জরুরি।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী ও বাস্তবধর্মী করতে হবে। বইয়ের জ্ঞান নয়, জীবনমুখী শিক্ষাই ভবিষ্যৎ ভারত গঠনের ভিত্তি হতে পারে।
যুবসমাজ ও রাজনীতি:-
যুবসমাজ রাজনীতির প্রতি বিমুখ হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। আজ অনেক তরুণ রাজনীতিকে দূষিত মনে করে দূরে সরে থাকে। কিন্তু রাজনীতি থেকে সরে থাকলে পরিবর্তন সম্ভব নয়। স্বচ্ছ ও আদর্শবান যুবসমাজ রাজনীতিতে প্রবেশ করলে দেশ সঠিক পথে পরিচালিত হবে।
ভোট দেওয়া, সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক পরিষেবায় যোগদান—এই সবই যুবসমাজের দায়িত্ব।
যুবসমাজ ও সমাজ গঠন:-
যুবসমাজ সমাজের দর্পণ। নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার—এই সব সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি যুবসমাজেরই রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রক্তদান শিবির, পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন—এইসব কাজে তরুণদের অংশগ্রহণ সমাজকে সুস্থ করে তোলে।
যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ ভারত:-
ভবিষ্যৎ ভারত কেমন হবে, তা নির্ভর করছে আজকের যুবসমাজ কেমন হচ্ছে তার উপর। যদি যুবসমাজ দায়িত্বশীল, শিক্ষিত ও নৈতিক হয়, তবে ভারত হবে—
অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী
সামাজিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক
বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর
সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ
অন্যদিকে যুবসমাজ যদি পথভ্রষ্ট হয়, তবে জনসংখ্যার এই বিশাল অংশই দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

করণীয় ও দায়িত্ব:- যুবসমাজকে আত্মনির্ভর ও কর্মদক্ষ করে তুলতে হবে।
নৈতিকতা ও দেশপ্রেমকে জীবনের অংশ করতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়াকে সময় নষ্টের মাধ্যম নয়, সচেতনতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নিজের দায়িত্ব বুঝে কাজ করতে হবে।
উপসংহার:- যুবসমাজই ভারতের ভবিষ্যৎ নয়, যুবসমাজই ভারতের বর্তমান। আজ তারা যেভাবে ভাবছে, কাজ করছে ও সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—সেই অনুযায়ীই আগামী ভারতের রূপরেখা তৈরি হবে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “আমাকে শক্তিশালী যুবক দাও, আমি জাতিকে গড়ে তুলব।” এই উক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভারতের অগ্রগতির মূলমন্ত্র।
যদি ভারতের যুবসমাজ আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যৎ ভারত শুধু একটি উন্নত দেশ নয়—একটি আদর্শ জাতি হিসেবেই বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হবে।
চাইলে আমি এটাকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *