পরিবেশ দূষণ।

ভূমিকা:-  পরিবেশ মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি। বায়ু, জল, মাটি, উদ্ভিদ, প্রাণী—এই সবকিছু মিলেই গঠিত পরিবেশ। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজের স্বার্থে পরিবেশকে ক্রমাগত শোষণ করছে। এর ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়েছে পরিবেশ দূষণ—যা আজ কেবল একটি সমস্যা নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্বের উপর এক গুরুতর হুমকি। পরিবেশ দূষণ আজ বিশ্বব্যাপী আলোচিত বিষয়, কারণ এর প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে।

পরিবেশ দূষণের ধারণা:-

পরিবেশ দূষণ বলতে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়াকে বোঝায়, যখন ক্ষতিকর পদার্থ বায়ু, জল ও মাটিতে মিশে জীবজগতের জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অবিবেচিত ভোগবাদ পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ।

পরিবেশ দূষণের প্রকারভেদ:-

১. বায়ু দূষণ
বায়ু দূষণ পরিবেশ দূষণের অন্যতম ভয়াবহ রূপ। কলকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের নির্গত গ্যাস, ইটভাটার ধোঁয়া, কয়লা ও পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানি পোড়ানো—এই সবই বায়ু দূষণের মূল কারণ।
বায়ু দূষণের ফলে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগের মতো মারাত্মক রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরাঞ্চলে শ্বাস নেওয়াই আজ একপ্রকার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২. জল দূষণ
নদী, খাল, বিল, পুকুর ও সমুদ্র—সব জলাশয়ই আজ দূষণের কবলে। শিল্পবর্জ্য, নিকাশি নোংরা জল, কীটনাশক ও সার নদীতে মিশে জলকে বিষাক্ত করে তুলছে।
গঙ্গা, যমুনা, হুগলি, গোদাবরী—ভারতের বহু পবিত্র নদী আজ দূষণের শিকার। জল দূষণের ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডের মতো রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে।
৩. মাটি দূষণ
অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, প্লাস্টিক বর্জ্য, শিল্পবর্জ্য মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে। মাটি দূষণের ফলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং খাদ্যশৃঙ্খল বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
৪. শব্দ দূষণ
অতিরিক্ত শব্দও এক ধরনের দূষণ। যানবাহনের হর্ন, লাউডস্পিকার, কলকারখানার শব্দ, আতশবাজি—সব মিলিয়ে শব্দ দূষণ মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, শ্রবণশক্তি হ্রাস শব্দ দূষণের ফল।
৫. আলোক ও তাপ দূষণ
শহরাঞ্চলে অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো রাতের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করছে। একইভাবে শিল্পায়নের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর অন্যতম কারণ।

পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ:-

অতিজনসংখ্যা – জনসংখ্যা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে বর্জ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর চাপ।
অবিবেচিত শিল্পায়ন – পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির অভাবে শিল্পবর্জ্য সরাসরি পরিবেশে মিশছে।
নগরায়ণ – গাছ কেটে বহুতল নির্মাণ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার – প্লাস্টিক সহজে নষ্ট হয় না এবং মারাত্মক দূষণ সৃষ্টি করে।
অসচেতনতা ও লোভ – পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের অসচেতনতা ও অতিরিক্ত ভোগবাদী মানসিকতা সমস্যাকে আরও জটিল করছে।

পরিবেশ দূষণের প্রভাব:-

মানবজীবনে প্রভাব:-

পরিবেশ দূষণের ফলে মানুষের গড় আয়ু কমছে। নানা ধরনের শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগ, ক্যানসার ও মানসিক রোগের প্রকোপ বাড়ছে। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রকৃতির উপর প্রভাব:-

বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, বহু প্রাণীর বিলুপ্তি পরিবেশ দূষণেরই ফল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।

পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন:-

পরিবেশ দূষণ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। হিমবাহ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যা উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলির জন্য মারাত্মক হুমকি।

পরিবেশ দূষণ রোধে করণীয়:-

বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ
প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো
পরিষ্কার ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার
শিল্পবর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা
গণসচেতনতা ও পরিবেশ শিক্ষা
কঠোর আইন ও তার প্রয়োগ
ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
পরিবেশ রক্ষায় শুধু সরকারের ভূমিকা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি নাগরিককে সচেতন হতে হবে। জল অপচয় বন্ধ করা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, আবর্জনা পৃথকীকরণ—এই ছোট ছোট কাজই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
রাষ্ট্রের উচিত পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ ও উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা।

উপসংহার:-

পরিবেশ দূষণ মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় আত্মঘাতী সমস্যা। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে উন্নয়ন সম্ভব নয়। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধী হয়ে থাকব।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত গভীর হবে, মানবজীবন ততই সুন্দর হবে।”
এই উপলব্ধি থেকেই আমাদের পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। সুস্থ পরিবেশই সুস্থ জীবন, আর সুস্থ জীবনই একটি সুন্দর ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *