দক্ষিণ ভারতের কর্নাটক রাজ্যের বাগলকোট জেলায় অবস্থিত বাদামি (Badami) হলো এমন এক ঐতিহাসিক স্থান, যেখানে প্রকৃতি, ভাস্কর্য ও ধর্ম এক অদ্ভুত ঐক্যে মিলেছে। লালচে বেলেপাথরের পাহাড় কেটে নির্মিত বাদামি গুহা মন্দিরগুলি (Badami Cave Temples) ভারতের প্রাচীন স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। এই গুহাগুলি শুধু ভ্রমণস্থল নয়—এ যেন সময়ের সোপান বেয়ে ফিরে যাওয়া ষষ্ঠ শতকের গৌরবময় অতীতে।
🕰️ ইতিহাসের সূচনা
ষষ্ঠ শতকে চালুক্য রাজবংশের শাসনামলে বাদামি ছিল তাদের রাজধানী, যার প্রাচীন নাম ছিল বাতাপুরী (Vatapi)। রাজা মঙ্গলেশ ও রাজা কীর্তিবর্মণ এই গুহাগুলির নির্মাণের সূচনা করেন। বলা হয়, চালুক্যরা ধর্ম, শিল্প ও স্থাপত্যে এমন এক যুগের সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
বাদামির গুহা মন্দিরগুলিতে হিন্দু, জৈন এবং বৌদ্ধ—তিন ধর্মের ছোঁয়া রয়েছে। প্রতিটি গুহা খোদাই করা হয়েছে লাল বেলেপাথরের পাহাড়ে, যা সূর্যের আলোয় রক্তিম আভা ছড়িয়ে দেয়—দেখতে যেন এক জীবন্ত শিল্পকর্ম।
🛕 গুহাগুলির স্থাপত্য ও দেবমূর্তি
বাদামিতে মোট চারটি প্রধান গুহা মন্দির রয়েছে, যেগুলি ক্রমান্বয়ে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠলে দেখা যায়।
- প্রথম গুহা:
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভগবান শিবকে উৎসর্গ করা হয়েছে এই গুহা। এখানে খোদাই করা নটরাজ রূপে শিবের ১৮ বাহুবিশিষ্ট মূর্তি অসাধারণ শিল্পকীর্তি। গুহার দেয়ালজুড়ে গণেশ, পার্বতী ও অন্যান্য দেবদেবীর সূক্ষ্ম খোদাই মুগ্ধ করে। - দ্বিতীয় গুহা:
এই গুহাটি বিষ্ণু দেবকে উৎসর্গিত। এখানে দেখা যায় বিষ্ণুর বামন অবতার, ত্রিবিক্রম অবতার ও বরাহ অবতার—সবই জীবন্ত ভাস্কর্যের মতো নিখুঁত। - তৃতীয় গুহা:
সবচেয়ে বড় ও সুদৃশ্য এই গুহাটিও বিষ্ণুকে উৎসর্গ করা। প্রায় ১৫০০ বছরের পুরনো এই গুহার ভাস্কর্যগুলি দক্ষিণ ভারতের শিল্পকলার এক অনন্য উদাহরণ। এখানে দেখা যায় মহাভারত ও রামায়ণের দৃশ্যসমূহের সূক্ষ্ম খোদাই। - চতুর্থ গুহা:
এটি জৈন ধর্মাবলম্বীদের গুহা। এখানে তীর্থঙ্কর মহাবীর ও অন্যান্য জৈন গুরুদের মূর্তি শান্তি ও তপস্যার প্রতীক হিসেবে খোদাই করা হয়েছে।
🌄 প্রকৃতির রূপে বাদামি
বাদামির সৌন্দর্য শুধুমাত্র গুহাতেই সীমাবদ্ধ নয়। গুহার সামনে বিস্তৃত আগস্ত্য হ্রদ (Agastya Lake) যেন পুরো পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি ধরে রাখে। বিকেলের আলোয় হ্রদের জলে যখন লাল পাথরের গুহাগুলি প্রতিফলিত হয়, তখন মনে হয় যেন দেবতারা এখনও সেখানে অধিষ্ঠিত।
গুহার উপরের পাহাড়চূড়ায় রয়েছে বাদামি দুর্গ, যেখান থেকে পুরো শহর ও হ্রদের অপরূপ দৃশ্য দেখা যায়। ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রকৃতির এই সমন্বয় পর্যটকদের মুগ্ধ করে রাখে ঘন্টার পর ঘন্টা।
🚗 যেভাবে পৌঁছানো যায়
- রেলপথে: নিকটতম রেলস্টেশন বাদামি, যা হুবলি ও বেঙ্গালুরু থেকে সংযুক্ত।
- সড়কপথে: হুবলি, বিজাপুর ও হাম্পি থেকে বাস বা গাড়িতে সহজেই পৌঁছানো যায়।
- আকাশপথে: নিকটতম বিমানবন্দর হুবলি (Hubli Airport), যা প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে।
🍲 থাকা ও খাওয়া
বাদামিতে পর্যটকদের জন্য আরামদায়ক রিসর্ট, হোটেল ও লজ আছে। কর্নাটকের ঐতিহ্যবাহী দোসা, ইডলি, সাম্বর, উপমা ও ফিল্টার কফি এখানকার বিশেষ খাবার। সন্ধ্যাবেলায় আগস্ত্য হ্রদের ধারে বসে স্থানীয় দোকানের মশলাদার চাট খাওয়া এক অন্যরকম আনন্দ দেয়।
🎭 ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বাদামি ভ্রমণের সেরা সময়। এই সময় আবহাওয়া ঠান্ডা ও মনোরম থাকে। এছাড়া প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত বাদামি উৎসব পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ।
💭 শেষ কথাঃ
বাদামি গুহা শুধুমাত্র পাথরের মন্দির নয়—এ যেন ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও শিল্পকলার মিলিত রূপ। গুহার নিঃশব্দ অন্ধকারে দাঁড়ালে মনে হয়, প্রাচীন শিল্পীরা যেন এখনও হাতুড়ি আর ছেনি হাতে খোদাই করছেন দেবতাদের মুখচ্ছবি।
এই গুহা ভ্রমণ মানেই এক মন্ত্রমুগ্ধ যাত্রা—যেখানে সময় থেমে যায়, আর পাথর কথা বলে।
🌺 “বাদামি—যেখানে পাথরের বুকে খোদাই করা আছে ভারতের আত্মা।” 🪶












Leave a Reply