ভ্রমণ প্রবন্ধ: কর্নাটকের হামপি – পাথরের শহরে হারানো গৌরবের গল্প।
ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে কর্নাটক রাজ্যের অন্তর্গত এক বিস্ময়কর স্থান হলো হামপি। তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত এই শহর একসময় ছিল গৌরবময় বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজধানী। আজ তার ধ্বংসস্তূপই যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। পাথরের প্রাচুর্যে গড়ে ওঠা এই শহরকে বলা হয় “পাথরের শহর” — যেখানে প্রতিটি স্তম্ভ, প্রতিটি ভাস্কর্য, প্রতিটি নিদর্শন অতীতের গল্প বলে যায় নিঃশব্দে।
🕰️ ইতিহাসের পাতায় হামপি
চতুর্দশ শতকে হরি হর ও বুক্কা রায় নামের দুই ভাই হামপিকে রাজধানী করে প্রতিষ্ঠা করেন বিজয়নগর সাম্রাজ্য। রাজা কৃষ্ণদেবরায়ের আমলে এই রাজ্য দক্ষিণ ভারতের শিল্প, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তৎকালীন বিদেশি ভ্রমণকারীরাও হামপির সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন।
কিন্তু ষোড়শ শতকে দাক্ষিণাত্য সুলতানদের যৌথ আক্রমণে বিজয়নগর পতিত হয়, আর সেই সোনালি নগরী রয়ে যায় ধ্বংসস্তূপে। তবুও তার ঐশ্বর্য আজও পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
🛕 দর্শনীয় স্থানসমূহ
হামপির প্রতিটি ইট যেন ইতিহাসের সাক্ষী। এখানে ঘুরে দেখা যায়—
- বিরূপাক্ষ মন্দির (Virupaksha Temple): হামপির প্রাচীনতম ও পূজিত মন্দির। প্রায় ৭ শতক পুরোনো এই মন্দিরের সুউচ্চ গোপুরম শহরের প্রতীক।
- বিত্তলা মন্দির (Vittala Temple): হামপির সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য। এখানকার পাথরের রথ (Stone Chariot) ও “সংগীত স্তম্ভ” (Musical Pillars) আজও বিস্ময় জাগায়।
- হেমকুট পাহাড়: সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অন্যতম সেরা স্থান। এখান থেকে পুরো হামপির পাথুরে রাজ্য চোখে পড়ে।
- লোটাস মহল (Lotus Mahal): রাজবাড়ির অভ্যন্তরে অবস্থিত এই স্থাপত্যে রাজকীয় সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে আছে ইসলামী ও হিন্দু স্থাপত্যশৈলীর অনন্য সংমিশ্রণ।
- হাজারা রাম মন্দির, রাজা মহল, রানি স্নানাগার, মহানবমি মণ্ডপ—সবগুলোই রাজকীয় জীবনযাত্রার নিদর্শন।
- তুঙ্গভদ্রা নদী: নদীর তীরে কোরাকল (বৃত্তাকার নৌকা) চড়ে ভ্রমণ এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
🌄 প্রকৃতির বুকে পাথরের রাজ্য
হামপি শুধুমাত্র ইতিহাসের জন্য বিখ্যাত নয়, প্রকৃতির রূপও এখানে বিস্ময়কর। পাহাড়, পাথর, নদী আর সবুজ ফসলের জমি মিলে তৈরি হয়েছে অপূর্ব দৃশ্যপট। পাথরের স্তূপগুলোর মাঝে সূর্যাস্তের আলো পড়লে শহরটা যেন আগুনের রঙে জ্বলে ওঠে।
🚗 যেভাবে পৌঁছানো যায়
- রেলপথে: নিকটতম স্টেশন হসপেট (Hospet), যা হামপি থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে।
- সড়কপথে: কর্নাটকের বেঙ্গালুরু, হুবলি কিংবা হায়দরাবাদ থেকে সরাসরি বাস বা গাড়ি ভাড়া করে হামপি পৌঁছানো যায়।
- আকাশপথে: নিকটতম বিমানবন্দর হুবলি বা বেঙ্গালুরু।
🎭 সংস্কৃতি ও উৎসব
প্রতি বছর নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয় হামপি উৎসব। তিন দিনব্যাপী এই উৎসবে সংগীত, নৃত্য, নাটক, লোকশিল্প, ও আতসবাজির প্রদর্শনীতে শহরটি আবারও জেগে ওঠে তার অতীত গৌরবে।
🍲 খাবার ও থাকার ব্যবস্থা
হামপিতে নানা ছোট গেস্টহাউস ও রিসর্ট আছে, যেখানে পর্যটকরা আরামে থাকতে পারেন। দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের মধ্যে দোসা, ইডলি, সাম্বর, ফিল্টার কফি এখানকার প্রধান আকর্ষণ। স্থানীয় বাজারে পাথর খোদাইয়ের শিল্পকর্ম ও হস্তশিল্পের জিনিসপত্রও পাওয়া যায়।
💭 শেষ কথাঃ
হামপি ভ্রমণ মানেই ইতিহাসের গহ্বরে পা রাখা। ধ্বংসাবশেষের মাঝে দাঁড়িয়ে যেন শোনা যায় সেই রাজসভা, সেই ঘণ্টাধ্বনি, সেই নর্তকীর নূপুরের শব্দ। এখানে প্রতিটি পাথর একেকটা গল্প বলে—সাম্রাজ্যের উত্থান, গৌরব আর পতনের।
প্রকৃতি, ইতিহাস ও স্থাপত্যের অনন্য মেলবন্ধন হামপি ভ্রমণকে স্মৃতিময় করে তোলে।
🌿 “হামপি—যেখানে পাথরও ইতিহাসের গান গায়।” 🏰












Leave a Reply