কর্নাটকের মাইসুরু প্যালেস: রাজকীয় ঐতিহ্যের সোনালি অধ্যায়।

ভারতের দক্ষিণে কর্নাটকের হৃদয়ে অবস্থিত মাইসুরু প্যালেস (Mysore Palace), যা শুধু কর্নাটকের গর্ব নয়, বরং সমগ্র ভারতের রাজকীয় ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক। স্থাপত্যের অনুপম নিদর্শন, ইতিহাসের সাক্ষ্য এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধনে মাইসুরু প্যালেস যেন এক জীবন্ত রাজপ্রাসাদ, যেখানে আজও প্রতিধ্বনিত হয় রাজাদের গৌরবগাথা।


🌺 ইতিহাসের পটে মাইসুরু প্যালেস

মাইসুরু প্যালেসের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো। একসময় এটি ছিল ওয়াডেয়ার রাজবংশের রাজপ্রাসাদ।
প্রথম প্রাসাদটি কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছিল, কিন্তু ১৮৯৭ সালে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
পরে ১৯১২ সালে ব্রিটিশ স্থপতি হেনরি ইরউইন-এর নকশায় যে প্রাসাদটি নির্মিত হয়, সেটিই আজকের বিখ্যাত মাইসুরু প্যালেস — এক অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য যা ভারতীয়, মুসলিম, রাজপুত ও গথিক শিল্পের সমন্বয়ে তৈরি।


🏰 স্থাপত্যের অপূর্ব রূপ

প্যালেসটির বাহ্যিক রূপ এতই মনোমুগ্ধকর যে প্রথম দর্শনেই মনে হবে এটি যেন কোনো পরীর রাজ্য।
গোলাপি রঙের গ্রানাইট পাথর, বিশাল গম্বুজ, খিলান, অলংকৃত স্তম্ভ ও নকশা—সব মিলে এটি এক স্বপ্নের প্রাসাদ।

ভিতরের মণ্ডপ, করিডর ও রাজদরবার চমকে দেয় তার সূক্ষ্ম কারুকার্যে।
বিশেষত দুর্বার হল (Durbar Hall) — রাজাদের সভা বসার স্থান, যার সোনালি খচিত ছাদ, রঙিন কাঁচের জানলা ও মসৃণ মেঝে আজও রাজকীয় ঐশ্বর্যের সাক্ষী।

এছাড়া প্রাসাদের গম্বুজগুলিতে ব্যবহৃত মার্বেল ও সোনার কাজ একে আরও মহিমান্বিত করে তুলেছে।


🌼 আলোকিত মাইসুরু প্যালেস

মাইসুরু প্যালেসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর আলোকসজ্জা
প্রতি রবিবার ও উৎসবের দিনে সন্ধ্যা নামতেই পুরো প্রাসাদ জ্বলে ওঠে প্রায় এক লক্ষেরও বেশি বাতির আলোয়
রাতের আকাশে সেই আলোকিত প্রাসাদ যেন মাটিতে নেমে আসা এক সোনালি দুর্গ — দর্শনার্থীদের চোখ ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে দশেরা উৎসবের সময় (মাইসুর দশেরা) এই প্রাসাদ জ্বলে ওঠে রাজকীয় সাজে। সঙ্গীত, নৃত্য, মিছিল, রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিকতা — সব মিলে এক জাদুময় আবহ তৈরি হয় পুরো শহরে।


🪔 মাইসুর দশেরা উৎসব

প্রতি বছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে দশেরা উৎসবে মাইসুরু প্যালেস হয়ে ওঠে ভারতের অন্যতম দর্শনীয় কেন্দ্র।
দশ দিনের এই উৎসব মাইসুর রাজবংশের সময় থেকে চলে আসছে।

শেষ দিনে দেবী চামুণ্ডেশ্বরীর প্রতিমা রাজকীয় হাতিতে চেপে শহর প্রদক্ষিণ করে — যাকে বলা হয় জম্বো সাভারি (Jumbo Savari)
এ দৃশ্য দেখতে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক ভিড় জমান।


🖼️ প্যালেসের ভিতরে যা দেখার মতো

প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করলে দর্শক এক ইতিহাসের সোনালি পাতায় প্রবেশ করেন।
এখানে রয়েছে —

  • রাজপরিবারের ব্যবহৃত অলংকার, অস্ত্রশস্ত্র ও রাজকীয় পোশাক
  • সোনার পালকি ও রুপোর সিংহাসন
  • ঐতিহাসিক চিত্রকর্মে ভরা গ্যালারি
  • রাজাদের তলোয়ার, ঢাল ও প্রাচীন আসবাব

প্যালেসের মেঝেতে ব্যবহৃত রঙিন টাইলস, ইতালীয় মার্বেল ও ময়ূরের পালকের নকশা শিল্পরসিকদের মুগ্ধ করে।


🌄 আশেপাশের দর্শনীয় স্থান

মাইসুরু শহরটি নিজেই এক ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের ভান্ডার।
প্যালেস দর্শনের পাশাপাশি দেখা যেতে পারে—

  • চামুণ্ডি হিলস (Chamundi Hills) — দেবী চামুণ্ডেশ্বরীর বিখ্যাত মন্দির
  • সেন্ট ফিলোমেনা চার্চ — দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রাচীন গির্জা
  • বৃন্দাবন গার্ডেনস (Brindavan Gardens) — সঙ্গীতের তালে তালে নৃত্যরত জলফোয়ারার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য
  • মাইসুরু জু (Mysore Zoo) — ভারতের প্রাচীনতম চিড়িয়াখানাগুলির একটি

🚗 কীভাবে পৌঁছানো যায়

বিমানপথে: নিকটবর্তী বিমানবন্দর বেঙ্গালুরু (প্রায় ১৪৫ কিমি দূরে)।
রেলপথে: মাইসুরু জংশন দেশের প্রধান শহরগুলির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত।
সড়কপথে: বেঙ্গালুরু থেকে সড়কপথে ৩ ঘণ্টার যাত্রায় সহজেই পৌঁছানো যায়।


🌿 ভ্রমণ অভিজ্ঞতা

মাইসুরু প্যালেসে প্রবেশ করলেই মনে হয় যেন ইতিহাসের রাজ্যে ফিরে গিয়েছি।
সোনার সিংহাসন, গম্ভীর রাজদরবার, রাজকীয় সংগীতের প্রতিধ্বনি, আর আলোয় মোড়া সন্ধ্যার প্রাসাদ — প্রতিটি মুহূর্ত মনে করিয়ে দেয় ভারতের রাজকীয় ঐতিহ্যের গৌরবময় অধ্যায়।

এ শুধু একটি প্রাসাদ নয়, এটি এক অনুভূতি — যেখানে অতীতের গরিমা ও বর্তমানের শ্রদ্ধা একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।


✨ উপসংহার

মাইসুরু প্যালেস ভারতের স্থাপত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক।
যে কেউ একবার এখানে এলে অনুভব করবেন— রাজাদের যুগ যেন এখনো শেষ হয়নি, তারা এখনো এই প্রাসাদের গম্বুজে, জানালায়, অলংকৃত সিঁড়িতে তাদের ঐতিহ্য রেখে গেছেন।

প্রকৃতি, ইতিহাস ও রাজকীয় গরিমা একত্রে দেখতে চাইলে মাইসুরু প্যালেসই হবে আপনার পরবর্তী গন্তব্য। 🌸🏰

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *