ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রাজ্য আসামের এক অনন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হল হাজো (Hajo)। ব্রহ্মপুত্র নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত এই ছোট্ট শহরটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেই নয়, ধর্মীয় সম্প্রীতির অপূর্ব প্রতীক হিসেবেও বিখ্যাত। এখানে হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ — তিন ধর্মেরই গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র রয়েছে, যা হাজোকে “Faith’s Confluence” বা “বিশ্বাসের মিলনভূমি” হিসেবে পরিচিত করেছে।
🌸 হাজোর ইতিহাস ও পরিচয়
‘হাজো’ শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এটি সংস্কৃত শব্দ “হস্তিপুর” থেকে এসেছে, আবার কেউ কেউ বলেন ‘হাজোর’ অর্থ বহু বা একাধিক তীর্থের সংযোগস্থল। প্রাচীন কাল থেকেই এটি কামরূপ রাজ্যের অংশ ছিল। আহোম রাজাদের সময় হাজো হয়ে ওঠে এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ ও ধর্মীয় কেন্দ্র।
🛕 হিন্দুদের তীর্থক্ষেত্র – হায়গ্রীব মাধব মন্দির
হাজোর সবচেয়ে বিখ্যাত ধর্মস্থান হলো হায়গ্রীব মাধব মন্দির। পাহাড়ের উপর অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দিরটি ১০ম শতাব্দীতে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। কিংবদন্তি অনুযায়ী, এখানে ভগবান বিষ্ণুর হায়গ্রীব অবতারের পূজা হয়, যিনি অশ্বমুখী রূপে মহাপ্রলয়ের পর বেদ পুনরুদ্ধার করেছিলেন।
মন্দিরটির স্থাপত্যশৈলীতে আহোম ও পল রাজবংশের ছাপ রয়েছে। মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা দেব-দেবীর মূর্তি, শিলালিপি ও অলংকরণ সত্যিই অনন্য। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে দোল উৎসব ও রথযাত্রা উপলক্ষে হাজোতে হাজারো ভক্তের সমাগম ঘটে।
☪️ মুসলমানদের পবিত্র স্থান – পুয়া মক্কা
হাজো শহরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হলো পুয়া মক্কা (Powa Mecca)। কথিত আছে, এটি মক্কা শরিফের এক-চতুর্থাংশ পবিত্র হিসেবে বিবেচিত। ১৭শ শতকে সুলতান শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ বিন মাওলা মুরাদ এই স্থানে মসজিদ নির্মাণ করেন। মুসলিম ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এখানে নামাজ আদায় করলে মক্কা শরিফে নামাজের সমান ফল লাভ হয়।
🪷 বৌদ্ধদের তীর্থক্ষেত্র – হায়গ্রীব মাধব মন্দিরেরই সংযোগ
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও হাজোকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করেন। তাঁদের বিশ্বাস, গৌতম বুদ্ধ মৃত্যুর পর নির্বাণ লাভ করেন এই হায়গ্রীব মাধব মন্দির প্রাঙ্গণেই। এই কারণে হাজোকে বৌদ্ধরা “পবিত্র ললিত বৌদ্ধ ভূমি” বলে অভিহিত করেন।
🌿 প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ
ব্রহ্মপুত্র নদীর তীর, সবুজ পাহাড় ও শান্ত নিরিবিলি গ্রামীণ পরিবেশ হাজোকে এক অপূর্ব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। মন্দির ও মসজিদ ঘুরে দেখা শেষে ভ্রমণকারীরা নদীর তীরে বসে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। এখানকার পরিবেশে একধরনের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি রয়েছে, যা প্রতিটি পর্যটকের মনে গভীর ছাপ ফেলে।
🛣️ কীভাবে পৌঁছাবেন হাজোতে
- বিমানপথে: গुवাহাটি বিমানবন্দর (লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদোলই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) হাজো থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে।
- রেলপথে: গुवাহাটি রেলস্টেশন থেকেই ট্যাক্সি বা বাসে সহজেই হাজো পৌঁছানো যায়।
- সড়কপথে: গुवাহাটির জালুকবাড়ি এলাকা থেকে নিয়মিত বাস ও ট্যাক্সি সার্ভিস রয়েছে। রাস্তা ভালো এবং যাত্রাপথও মনোরম।
🏨 কোথায় থাকবেন
হাজো ছোট শহর হলেও এখানে বেশ কিছু গেস্ট হাউস, ধর্মশালা ও লজ রয়েছে। গुवাহাটিতে বিভিন্ন মানের হোটেল থাকায় অনেকেই সেখানেই থাকেন এবং দিনভ্রমণে হাজো ঘুরে আসেন।
💫 উপসংহার
হাজো এমন এক জায়গা যেখানে ধর্মের সীমারেখা মুছে গিয়ে মানবতার আলো জ্বলে ওঠে। এক পাহাড়ে বিষ্ণু, আরেক প্রান্তে মক্কার ছোঁয়া, মাঝখানে বুদ্ধের শান্ত মুখ — এমন মিলনভূমি পৃথিবীতে বিরল। হাজো তাই কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি আধ্যাত্মিক ঐক্যের প্রতীক।
✨ “হাজো শেখায় — আলাদা ধর্ম নয়, ভক্তিই মানুষকে একত্র করে।” ✨












Leave a Reply