ভূমিকা:- শিক্ষা মানবসভ্যতার অগ্রগতির মূল ভিত্তি। কিন্তু সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী—নারীরা—যদি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকে, তবে সেই সমাজ কখনোই পূর্ণ উন্নতি লাভ করতে পারে না। নারীশিক্ষা কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির সার্বিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যে সমাজে নারীরা শিক্ষিত, সেই সমাজেই গড়ে ওঠে সুস্থ পরিবার, সচেতন প্রজন্ম ও শক্তিশালী রাষ্ট্র। তাই নারীশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
নারীশিক্ষার ধারণা:- নারীশিক্ষা বলতে শুধু পড়তে-লিখতে শেখাকেই বোঝায় না। এর অর্থ হলো নারীর মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক বিকাশ। শিক্ষা নারীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করে, যুক্তিবোধ তৈরি করে এবং তাকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলে। শিক্ষিত নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন এবং সমাজের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা নিতে সক্ষম হন।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে নারীশিক্ষার অবস্থা:- ভারতের প্রাচীন যুগে নারীশিক্ষা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল না। গার্গী, মৈত্রেয়ী, লোপামুদ্রার মতো বিদুষী নারীরা প্রমাণ করেন যে বৈদিক যুগে নারীরা শিক্ষায় অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু মধ্যযুগে সামাজিক কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, পর্দা প্রথা ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নারীশিক্ষা ক্রমশ অবহেলিত হয়ে পড়ে।
আধুনিক যুগে নারীশিক্ষার প্রসার:- ঊনবিংশ শতাব্দীতে সমাজসংস্কারকদের প্রচেষ্টায় নারীশিক্ষার নবজাগরণ ঘটে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, বেগম রোকেয়া, পণ্ডিতা রামাবাই প্রমুখ নারীশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর ভারত সরকার নারীশিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় স্থান দেয়। আজ স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা ক্ষেত্রেও নারীদের উপস্থিতি ক্রমবর্ধমান।
নারীশিক্ষার সামাজিক গুরুত্ব
১. পরিবার গঠনে নারীশিক্ষার ভূমিকা
একজন শিক্ষিত মা একটি শিক্ষিত জাতির জন্ম দেন। নারীই সন্তানের প্রথম শিক্ষক। শিক্ষিত মা সন্তানকে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে সক্ষম হন। ফলে পরিবার হয় সুস্থ ও সচেতন।
২. কুসংস্কার দূরীকরণ
শিক্ষা নারীদের কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে শিক্ষিত নারীরাই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন।
নারীশিক্ষার অর্থনৈতিক গুরুত্ব:- শিক্ষিত নারী কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করে পরিবার ও দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। আজ নারীরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নারীশিক্ষা বাড়লে দারিদ্র্য কমে, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়।
নারীশিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়ন:-
নারীশিক্ষাই নারী ক্ষমতায়নের মূল চাবিকাঠি। শিক্ষা নারীদের আত্মসম্মান ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়। শিক্ষিত নারী নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—বিবাহ, মাতৃত্ব, পেশা সব ক্ষেত্রেই। এর ফলে সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
নারীশিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা:-
শিক্ষিত নারী স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে সচেতন হন। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে নারীশিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। পরিবার পরিকল্পনা, পরিচ্ছন্নতা ও পুষ্টিকর খাদ্য সম্পর্কে শিক্ষিত নারীর জ্ঞান সমাজকে সুস্থ রাখে।
নারীশিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়ন:-
কোনো দেশ তখনই প্রকৃত উন্নয়ন লাভ করে, যখন তার নারী ও পুরুষ সমানভাবে শিক্ষিত হয়। নারীশিক্ষা জাতীয় উন্নয়নের গতি বাড়ায়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ক্রীড়া, প্রশাসন—সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ দেশকে বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বর্তমান ভারতে নারীশিক্ষার চিত্র:-
বর্তমানে ভারতের নারী সাক্ষরতার হার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে, তবে গ্রামাঞ্চল ও পিছিয়ে পড়া সমাজে এখনও অনেক সমস্যা রয়েছে। দারিদ্র্য, সামাজিক মানসিকতা, নিরাপত্তাহীনতা ও বিদ্যালয়ের অভাব নারীশিক্ষার পথে বড় বাধা।
নারীশিক্ষার পথে প্রধান বাধাসমূহ:-
বাল্যবিবাহ
দারিদ্র্য
কুসংস্কার ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা:-
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব
নিরাপত্তাজনিত সমস্যা
নারীশিক্ষা প্রসারে করণীয়
বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা
মেয়েদের জন্য বিশেষ বৃত্তি ও সহায়তা
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি
নিরাপদ ও অনুকূল শিক্ষার পরিবেশ
নারীশিক্ষাকে পরিবার ও সমাজের অগ্রাধিকার করা
নারীশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ সমাজ
ভবিষ্যৎ সমাজ হবে জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক—এমন সমাজ গঠনে নারীশিক্ষার ভূমিকা অপরিহার্য। শিক্ষিত নারী সমাজে নেতৃত্ব দেবে, নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করবে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নেবে।
উপসংহার
নারীশিক্ষা কোনো দয়া নয়, এটি নারীর অধিকার। নারীকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করা মানে জাতিকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। সমাজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য নারী ও পুরুষের সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন,
“যে জাতি নারীদের সম্মান করে না, সে জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না।”
এই বাণীকে সামনে রেখে যদি আমরা নারীশিক্ষাকে সমাজের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করি, তবে নিশ্চিতভাবেই একটি উন্নত, মানবিক ও শক্তিশালী জাতি গড়ে উঠবে।












Leave a Reply