ছোট্ট রথের জেদ থেকেই শুরু, কঙ্কাবতীতে সুমনার রথযাত্রা এখন গ্রামের গর্ব।।

মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা : – মাত্র তিন বছর বয়সে একটি ছোট্ট রথের জন্য কান্না। সেই শিশুসুলভ আবদারই আজ পরিণত হয়েছে ২২ বছরের এক অনন্য ঐতিহ্যে। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মেদিনীপুর সদর ব্লকের কঙ্কাবতী গ্রামের বাসিন্দা সুমনা দাস টানা ২২ বছর ধরে নিজের হাতে সাজানো রথ নিয়ে রথযাত্রার শোভাযাত্রার আয়োজন করে চলেছেন। বর্তমানে তিনি বি.এড.-এর ছাত্রী। পড়াশোনার ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিবছর রথ এলেই তাঁর বাড়িতে শুরু হয়ে যায় উৎসবের আমেজ।
রথযাত্রার প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। রথ পরিষ্কার করা, নতুন করে রং করা, বিভিন্ন ছবি আঁকা এবং নানান সাজসজ্জায় রথকে আকর্ষণীয় করে তোলেন সুমনা নিজেই। রথযাত্রার দিন খোল-করতাল সহযোগে হরিনাম সংকীর্তন, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের তালে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। গ্রামের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন। ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণও করা হয়।
এই উদ্যোগের সূচনার কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সুমনা। তিনি বলেন, “আমার যখন মাত্র তিন বছর বয়স, তখন মায়ের কোলে চেপে গ্রামের রথ দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখি অনেক বাচ্চার হাতে ছোট ছোট রথ। আমার হাতেও একটি রথ চাই বলে জেদ ধরি। কিন্তু দোকানে তখন আর কোনও রথ অবশিষ্ট ছিল না। মা অনেক চেষ্টা করেও আমাকে বোঝাতে পারেননি। তখনই আমাদের পাড়ার রাজু বারিক কাকু বলেছিলেন, তিনি আমার জন্য রথ বানিয়ে দেবেন। পরের দিন সত্যিই আমার উচ্চতার থেকেও বড় একটি রথ তৈরি করে দেন। সেই রথ নিয়েই আমার রথযাত্রার শুরু।”
তিনি আরও বলেন, “কয়েক বছর পর আমার উচ্চতা বেড়ে গেলে সেই রথটি ছোট মনে হতে থাকে। তখন আবার নতুন করে বড় রথের আবদার করি। পাড়ারই এক দাদু আরও বড় একটি কাঠের রথ তৈরি করে দেন। সেই রথই আজও ব্যবহার করছি। প্রতি বছর নিজের হাতে সাজিয়ে শোভাযাত্রা বের করি। ভক্তি আর ভালোবাসা থেকেই এই আয়োজন করে আসছি।”
রথযাত্রার দিন দেবতাকে মাসির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সাত দিন ধরে নিয়ম মেনে পূজার্চনা চলে। উল্টো রথের দিন একই শোভাযাত্রার মাধ্যমে দেবতার বাড়ি ফেরা হয়। এই কয়েকদিন বাড়িতে কার্যত উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়।
সুমনার বাবা ভবতারণ দাস পেশায় ব্যবসায়ী এবং মা বুবুন দাস গৃহবধূ। মেয়ের এই উদ্যোগে প্রথম দিন থেকেই পাশে রয়েছেন তাঁরা। রথযাত্রার সমস্ত খরচ পরিবার বহন করে। রথ সাজানো, শোভাযাত্রার আয়োজন, প্রসাদ বিতরণ-সহ প্রতিটি কাজে পরিবারের সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
প্রথমে এটি ছিল একটি পারিবারিক উদ্যোগ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে কঙ্কাবতী গ্রামের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে এই রথযাত্রা। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ এই শোভাযাত্রায় সামিল হন। ছোটবেলার এক আবেগ আজ গ্রামের মানুষের মিলনমেলা, ভক্তি ও সম্প্রীতির এক সুন্দর নিদর্শন হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *