শীতকালে জয়েন্টের ব্যথা ও বাতের সমস্যা থেকে কীভাবে স্বস্তি পাবেন? হাড় ও গাঁট ভালো রাখতে মেনে চলুন ১০টি নিয়ম।

শীতের মরশুমে তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের শরীরে নানা ধরনের অস্বস্তি দেখা দেয়। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, বাতের সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ এবং যাঁদের হাঁটু, কোমর, কাঁধ কিংবা আঙুলের গাঁটে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা রয়েছে, তাঁরা শীতকালে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত-পা শক্ত হয়ে থাকা, সিঁড়ি ভাঙতে অসুবিধা, হাঁটাচলার সময় হাঁটুতে ব্যথা কিংবা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর উঠে দাঁড়াতে কষ্ট হওয়ার মতো সমস্যা অনেকের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে।

তবে শীতকাল এলেই যে সবার জয়েন্টের ব্যথা বাড়বে, তা নয়। ঠান্ডার সময় শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়া, পেশির টান এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যথার অনুভূতির সম্পর্ক থাকতে পারে। আবার দীর্ঘস্থায়ী বাত বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। তাই ব্যথাকে অবহেলা না করে সঠিক যত্ন নেওয়া জরুরি।

শীতকালে হাড় ও গাঁট সুস্থ রাখতে এবং দৈনন্দিন অস্বস্তি কমাতে মেনে চলুন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম।

১. শরীরকে উষ্ণ রাখুন

শীতকালে ঠান্ডার কারণে পেশিতে শক্তভাব ও অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। তাই শরীরকে আরামদায়ক উষ্ণতায় রাখা জরুরি। বাইরে বেরোনোর সময় আবহাওয়া অনুযায়ী গরম পোশাক পরুন। হাঁটু, হাত, পা এবং শরীরের অন্যান্য অংশ ঠান্ডা থেকে রক্ষা করুন।

যাঁদের সকালে গাঁট শক্ত হয়ে থাকে, তাঁরা বিছানা থেকে ওঠার আগে হাত-পা ধীরে ধীরে নাড়াতে পারেন। কয়েক মিনিট হালকা স্ট্রেচিং করলে চলাফেরা শুরু করতে সুবিধা হতে পারে।

তবে শরীর গরম করার জন্য অতিরিক্ত গরম জলের ব্যাগ বা হিটিং প্যাড সরাসরি ত্বকে লাগাবেন না। বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা স্নায়ুর অনুভূতি কমে যাওয়ার সমস্যা থাকলে ত্বক পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। হালকা উষ্ণ সেঁক দেওয়ার আগে তাপমাত্রা নিরাপদ কি না নিশ্চিত করুন।

২. নিয়মিত হাঁটাচলা করুন

শীতকালে ঠান্ডার কারণে অনেকেই ঘরের মধ্যে দীর্ঘ সময় বসে বা শুয়ে থাকেন। এতে পেশির শক্তি কমতে পারে এবং জয়েন্টের নমনীয়তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ব্যথা সহনীয় থাকলে নিয়মিত হালকা শারীরিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া উপকারী।

আবহাওয়া অনুকূল থাকলে প্রতিদিন অল্প সময় হাঁটুন। প্রথমে পাঁচ থেকে দশ মিনিট দিয়ে শুরু করতে পারেন। প্রয়োজন হলে দিনের মধ্যে কয়েকবার অল্প অল্প করে হাঁটুন।

হাঁটার সময় ব্যথা বেড়ে গেলে গতি কমিয়ে দিন বা বিশ্রাম নিন। হাঁটুতে সমস্যা থাকলে সমতল রাস্তা বেছে নিন এবং আরামদায়ক জুতো ব্যবহার করুন। তীব্র ব্যথা, নতুন করে ফোলা বা হাঁটতে না পারার মতো সমস্যা থাকলে ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৩. হালকা স্ট্রেচিং ও উপযুক্ত ব্যায়াম করুন

জয়েন্টের নমনীয়তা এবং পেশির শক্তি বজায় রাখতে উপযুক্ত ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব ধরনের ব্যায়াম সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। তাই নিজের বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং ব্যথার ধরন অনুযায়ী ব্যায়াম বেছে নিন।

চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শে হাঁটু সোজা-ভাঁজ করার সহজ অনুশীলন, গোড়ালি নাড়ানো, হালকা স্ট্রেচিং কিংবা চেয়ারে বসে পা নাড়ানোর মতো ব্যায়াম করা যেতে পারে।

যাঁদের হাঁটুতে অস্টিওআর্থ্রাইটিস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম এবং কম ধাক্কাযুক্ত শারীরিক কার্যকলাপ উপকারী হতে পারে। তবে ব্যায়ামের সময় তীব্র ব্যথা হলে জোর করবেন না। নিয়মিত ও ধীরে ধীরে ব্যায়াম বাড়ানোই ভালো।

৪. ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার খান

হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালসিয়াম হাড়ের গঠন বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে ভূমিকা রাখে।

দৈনন্দিন খাবারে দুধ, দই, ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার, উপযুক্ত সবুজ শাকসবজি এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন। খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী ডিম, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টির উৎসও বেছে নেওয়া যেতে পারে।

ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা এবং সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। নিজে থেকে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডি ট্যাবলেট খাওয়া ঠিক নয়, কারণ অতিরিক্ত মাত্রা ক্ষতিকর হতে পারে।

মনে রাখতে হবে, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলি সব ধরনের গাঁটের ব্যথা সারানোর ওষুধ নয়।

৫. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

শরীরের ওজন বেশি হলে হাঁটু ও কোমরের মতো ওজন বহনকারী জয়েন্টের উপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ওজন নিয়ন্ত্রণ ব্যথা কমাতে এবং চলাফেরা সহজ করতে সাহায্য করতে পারে।

ওজন কমানোর জন্য হঠাৎ কঠোর ডায়েট শুরু করবেন না। বরং খাবারের পরিমাণ ও গুণমানের দিকে নজর দিন। শাকসবজি, ফল, ডাল, উপযুক্ত প্রোটিন এবং গোটা শস্যের মতো খাবার খাদ্যতালিকায় রাখুন।

অতিরিক্ত ভাজাভুজি, চিনিযুক্ত পানীয় ও অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাকসের পরিমাণ কমান। নিয়মিত হাঁটাচলা এবং নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী শরীরচর্চা চালিয়ে যান।

বয়স্ক বা দুর্বল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সাহায্যে উপযুক্ত পরিকল্পনা তৈরি করুন।

৬. দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকবেন না

একটানা দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা একই ভঙ্গিতে কাজ করার ফলে অনেকের কোমর, ঘাড়, কাঁধ কিংবা হাঁটুতে অস্বস্তি বাড়তে পারে। শীতকালে ঘরের মধ্যে বেশি সময় কাটানোর কারণে এই অভ্যাস আরও বেড়ে যায়।

কাজের ফাঁকে নিয়মিত বিরতি নিন। কিছুক্ষণ পরপর উঠে দাঁড়ান, অল্প হাঁটুন এবং হাত-পা ধীরে নাড়ান। দীর্ঘ সময় মেঝেতে বসে থাকা বা এমন ভঙ্গিতে থাকা এড়িয়ে চলুন, যাতে উঠে দাঁড়াতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে।

চেয়ারে বসার সময় পিঠের যথাযথ সমর্থন রাখুন এবং পা মেঝেতে রাখার চেষ্টা করুন। যাঁদের হাঁটুতে সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য খুব নিচু চেয়ার থেকে ওঠানামা করা কষ্টকর হতে পারে। তাই আরামদায়ক উচ্চতার চেয়ার ব্যবহার করা ভালো।

৭. ব্যথা কমাতে সেঁক দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হালকা উষ্ণ সেঁক পেশির টান বা জয়েন্টের শক্তভাব কমিয়ে সাময়িক আরাম দিতে পারে। বিশেষ করে সকালে গাঁট শক্ত হয়ে থাকলে উষ্ণ স্নান বা নিরাপদ উষ্ণ সেঁক আরামদায়ক হতে পারে।

তবে জয়েন্টে নতুন করে ফোলা, লালচে ভাব বা তীব্র প্রদাহ থাকলে গরম সেঁক উপযুক্ত কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শে ঠিক করা ভালো। কিছু পরিস্থিতিতে ঠান্ডা সেঁক ব্যথা ও ফোলা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

বরফ কখনও সরাসরি ত্বকে লাগাবেন না। কাপড়ে মুড়ে অল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করুন এবং ত্বকের অবস্থা খেয়াল রাখুন। অনুভূতি কমে যাওয়া, রক্তসঞ্চালনের সমস্যা বা ত্বকের বিশেষ অসুস্থতা থাকলে সেঁক দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৮. নিজের ইচ্ছায় ব্যথার ওষুধ খাবেন না

জয়েন্টের ব্যথা হলে অনেকেই দোকান থেকে ব্যথানাশক ওষুধ কিনে খেয়ে নেন। কিন্তু কিছু ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘদিন বা অনুপযুক্ত মাত্রায় ব্যবহার করলে পাকস্থলী, কিডনি, রক্তচাপ এবং হৃদ্‌যন্ত্রের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, কিডনির অসুস্থতায় আক্রান্ত মানুষ, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্‌রোগে ভোগা ব্যক্তি এবং রক্ত পাতলা করার ওষুধ ব্যবহারকারীদের বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার।

ব্যথা বারবার হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের সাহায্য নিন। প্রয়োজনে চিকিৎসক উপযুক্ত ওষুধ, ফিজিওথেরাপি কিংবা অন্য চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন। নিজে থেকে স্টেরয়েড, ইনজেকশন বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যথানাশক ব্যবহার করবেন না।

৯. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিন

পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার এবং সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে ব্যথা সামলানো কঠিন হতে পারে এবং ক্লান্তি বেড়ে যেতে পারে।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন। ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন এবং বিছানা থেকে ওঠার সময় ধীরে ধীরে নড়াচড়া করুন।

তবে বিশ্রাম নেওয়ার অর্থ সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকা নয়। দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকলে পেশির শক্তি ও চলাফেরার ক্ষমতা কমতে পারে। তাই ব্যথার মাত্রা অনুযায়ী বিশ্রাম ও হালকা সক্রিয়তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখুন।

১০. কোন লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

সব জয়েন্টের ব্যথা শীতের কারণে হয় না। অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, আঘাত, সংক্রমণ কিংবা অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যার কারণেও ব্যথা হতে পারে।

নিচের লক্ষণগুলি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:

  • জয়েন্টে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, ফোলা বা লালচে ভাব দেখা দেওয়া।
  • জয়েন্ট গরম হয়ে যাওয়ার সঙ্গে জ্বর হওয়া।
  • ব্যথার কারণে হাঁটতে বা হাত-পা নাড়াতে না পারা।
  • পড়ে যাওয়া বা আঘাতের পর তীব্র ব্যথা হওয়া।
  • দীর্ঘদিন ব্যথা থাকা, সকালে দীর্ঘ সময় গাঁট শক্ত থাকা কিংবা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হওয়া।

বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে হঠাৎ কোনও জয়েন্ট ফুলে গেলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। জয়েন্টে সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

উপসংহার

শীতকালে জয়েন্টের ব্যথা ও গাঁটের শক্তভাব অনেকের দৈনন্দিন জীবনে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তবে শরীরকে উষ্ণ রাখা, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, পুষ্টিকর খাবার, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই আরাম পাওয়া সম্ভব।

ব্যথা হলেই শুধু ঠান্ডাকে দায়ী করবেন না। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা নতুন কোনও অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করাই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার সেরা উপায়।

মনে রাখবেন, বয়স বাড়লেই গাঁটের ব্যথা মেনে নিয়ে চুপ করে থাকতে হবে—এমন নয়। নিয়মিত যত্ন, উপযুক্ত শারীরিক কার্যকলাপ এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে শীতের মরশুমেও অনেকটা স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *