ভূমিকা: সবাই প্রশংসা করবে, এমন প্রত্যাশা কেন?
মানুষ প্রশংসা পেতে ভালোবাসে। কেউ আমাদের কাজের স্বীকৃতি দিলে, আমাদের যোগ্যতার কথা বললে কিংবা আমাদের সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করলে মন ভালো হয়ে যায়। মনে হয়, আমাদের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে, আমাদের চেষ্টা অন্যের চোখে মূল্য পেয়েছে। কিন্তু জীবনের পথ সব সময় প্রশংসায় ভরে থাকে না। কখনো আসে সমালোচনা, কখনো শুনতে হয় অপছন্দের কথা, আবার কখনো নিজের ভালো কাজেরও যথাযথ স্বীকৃতি মেলে না।
এমন পরিস্থিতিতে আমাদের প্রকৃত চরিত্রের পরীক্ষা হয়। আমরা কি শুধু প্রশংসা পেলে ভালো কাজ করতে পারি, নাকি স্বীকৃতি না পেলেও নিজের কর্তব্য পালন করি? সমালোচনা শুনলেই কি ভেঙে পড়ি, নাকি তার মধ্যে গ্রহণযোগ্য কিছু থাকলে তা থেকে শিক্ষা নিই? অন্যের মতামতের ওপর নির্ভর করেই কি নিজের মূল্য নির্ধারণ করি, নাকি নিজের বিবেক ও নৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে চলতে শিখি?
নৈতিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশংসা ও সমালোচনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। প্রশংসায় অহংকারী না হওয়া এবং সমালোচনায় অকারণে ভেঙে না পড়া—এই দুই গুণ মানুষকে মানসিকভাবে পরিণত করে।
কারণ, জীবনের প্রকৃত সাফল্য শুধু মানুষের বাহবা পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো এমন চরিত্র গড়ে তোলা, যা মানুষের প্রশংসায় যেমন সংযত থাকে, তেমনই অন্যায় সমালোচনার মুখেও নিজের নৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে পারে।
প্রশংসা আমাদের ভালো লাগে কেন?
প্রশংসা মানুষের স্বাভাবিক চাহিদার সঙ্গে যুক্ত। আমরা চাই, আমাদের পরিশ্রম অন্যরা বুঝুক, আমাদের অবদানকে গুরুত্ব দিক এবং আমাদের ভালো কাজের স্বীকৃতি জানাক। এই প্রত্যাশা অস্বাভাবিক নয়।
একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করলে শিক্ষক বা পরিবারের কাছ থেকে প্রশংসা পেলে তার আত্মবিশ্বাস বাড়তে পারে। একজন কর্মী নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে স্বীকৃতি পেলে ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা পেতে পারেন। কেউ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে তাঁর কাজের প্রশংসা অন্যদেরও মানবিক কাজে উৎসাহিত করতে পারে।
অতএব, প্রশংসা নিজে খারাপ কিছু নয়। আন্তরিক প্রশংসা মানুষকে উৎসাহ দেয়, সম্পর্ককে উষ্ণ করে এবং ভালো কাজের মূল্য বোঝায়।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রশংসা আমাদের কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যদি শুধু বাহবা পাওয়ার জন্য ভালো কাজ করি, তাহলে স্বীকৃতি না মিললে সেই কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারি।
কখনো কখনো প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে এমন কাজেও প্ররোচিত করে, যা তার প্রকৃত মূল্যবোধের সঙ্গে মেলে না। সে হয়তো অন্যের সামনে নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে গিয়ে নিজের ভুল লুকিয়ে রাখে, অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে চালায় কিংবা মানুষের মন জয় করার জন্য অপ্রয়োজনীয় প্রতিশ্রুতি দেয়।
এই কারণে আমাদের বুঝতে হবে, প্রশংসা আনন্দের বিষয় হতে পারে, কিন্তু তা যেন আমাদের বিবেকের নিয়ন্ত্রক হয়ে না ওঠে।
প্রশংসা গ্রহণ করুন, কিন্তু অহংকারকে জায়গা দেবেন না
কেউ আমাদের প্রশংসা করলে তা বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। নিজের কাজের স্বীকৃতি পেয়ে আনন্দিত হওয়ার মধ্যে কোনো দোষ নেই। কিন্তু সেই প্রশংসা থেকে যদি মনে হয়, আমরা অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং আমাদের ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই, তাহলে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
ধরা যাক, একজন শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াচ্ছেন। তাঁর শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করছে এবং অভিভাবকেরা তাঁর প্রশংসা করছেন। এই স্বীকৃতি তাঁকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু যদি তিনি ভাবতে শুরু করেন যে তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতিতে আর কোনো উন্নতির প্রয়োজন নেই, তাহলে তিনি নতুন কিছু শেখার সুযোগ হারাবেন।
একইভাবে, কোনো লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, চিকিৎসক কিংবা সমাজকর্মী প্রশংসা পেতে পারেন। কিন্তু প্রশংসা যতই বাড়ুক, নিজের কাজের মান যাচাই করা এবং নতুন কিছু শেখার মানসিকতা বজায় রাখা জরুরি।
প্রকৃত বিনয় মানে নিজের যোগ্যতাকে অস্বীকার করা নয়। বরং নিজের সাফল্যকে স্বীকার করেও বুঝতে পারা যে শেখার পথ এখনও শেষ হয়নি।
অনেক সাফল্যের পেছনে নিজের পরিশ্রমের পাশাপাশি অন্যের সাহায্য, সহযোগিতা এবং সুযোগও কাজ করে। তাই প্রশংসা পেলে নিজের অবদানের পাশাপাশি সহযোগীদের অবদানও মনে রাখা উচিত।
সমালোচনা মানেই শত্রুতা নয়
সমালোচনা শুনলে অনেকেই মনে করেন, তাঁদের অপমান করা হচ্ছে। কেউ তাঁদের কাজের ত্রুটি দেখালে তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে আত্মপক্ষসমর্থনে নেমে পড়েন। কখনো রেগে যান, কখনো সম্পর্ক নষ্ট করেন, আবার কখনো সমালোচনাকারীকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন।
কিন্তু সব সমালোচনা এক রকম নয়।
কিছু সমালোচনা আন্তরিক হয়। তার উদ্দেশ্য থাকে ভুল ধরিয়ে দেওয়া, কাজের মান উন্নত করা কিংবা কোনো সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আবার কিছু সমালোচনা হতে পারে বিদ্বেষপূর্ণ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা অপমান করার জন্য করা।
এই দুই ধরনের সমালোচনাকে আলাদা করে চিনতে শেখা জরুরি।
যদি কোনো ব্যক্তি যুক্তি দিয়ে আমাদের কাজের দুর্বলতা তুলে ধরেন, তাহলে তাঁর বক্তব্য বিবেচনা করা উচিত। তিনি আমাদের পছন্দের মানুষ কি না, তা নয়; বরং তাঁর কথার মধ্যে সত্য বা উপযোগিতা আছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, কেউ যদি অপমানজনক ভাষায় কথা বলেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন কিংবা মিথ্যা অভিযোগ তোলেন, তাহলে তাঁর প্রতিটি বক্তব্য মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
নৈতিকভাবে পরিণত মানুষ সমালোচনা শুনে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখান না। তিনি আগে বোঝার চেষ্টা করেন, তারপর বিচার করেন এবং প্রয়োজন হলে নিজের আচরণ সংশোধন করেন।
গঠনমূলক সমালোচনা থেকে শেখার ক্ষমতা
জীবনে উন্নতি করতে হলে নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। কিন্তু অনেক সময় আমরা নিজের দুর্বলতা দেখতে পাই না। অন্যের গঠনমূলক সমালোচনা সেই অদেখা দিকগুলি বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ভালো বক্তা হতে চান। তিনি মনে করেন, তাঁর বক্তব্য যথেষ্ট আকর্ষণীয়। কিন্তু একজন শ্রোতা তাঁকে জানালেন যে তিনি খুব দ্রুত কথা বলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি স্পষ্ট করে বোঝানোর সুযোগ দেন না।
তিনি যদি কথাটি ব্যক্তিগত অপমান বলে মনে করেন, তাহলে উন্নতির একটি সুযোগ হারাবেন। কিন্তু যদি নিজের বক্তব্য দেওয়ার ধরন পর্যালোচনা করেন, তাহলে ধীরে কথা বলা, বিরতি দেওয়া এবং বিষয়গুলি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবেন।
একইভাবে, কোনো কর্মী সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারলে সহকর্মীর পরামর্শ থেকে নিজের সময় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বুঝতে পারেন। কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষক বা সহপাঠীর মতামত থেকে নিজের পড়াশোনার পদ্ধতি উন্নত করতে পারেন।
গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করার অর্থ অন্যের সব মতামত অন্ধভাবে মেনে নেওয়া নয়। বরং নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করে উপযোগী অংশ গ্রহণ করা।
নিজেকে একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—“এই সমালোচনার মধ্যে এমন কিছু আছে কি, যা আমাকে আরও ভালো মানুষ বা আরও দক্ষ কর্মী হতে সাহায্য করবে?”
এই প্রশ্নটি সমালোচনার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে।
অন্যায় সমালোচনার মুখে আত্মমর্যাদা রক্ষা
সব সমালোচনা যে সত্য বা ন্যায্য হবে, এমন নয়। অনেক সময় মানুষ ঈর্ষা, ব্যক্তিগত বিরোধ, ভুল ধারণা কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে অন্যের সমালোচনা করেন।
কেউ ভালো কাজ করলেও তাঁকে ছোট করার চেষ্টা হতে পারে। কেউ নিজের মত প্রকাশ করলেই তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার হতে পারে। আবার কোনো ব্যক্তি ভুল না করেও অন্যের সিদ্ধান্তের কারণে অন্যায় অভিযোগের মুখোমুখি হতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি অভিযোগকে সত্য বলে মেনে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনই রাগের মাথায় পাল্টা অপমান করাও সমাধান নয়।
প্রথমে অভিযোগের প্রকৃতি বোঝা দরকার। যদি ভুল বোঝাবুঝি থাকে, তাহলে শান্তভাবে তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যেতে পারে। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করে যথাযথভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরা উচিত।
কিন্তু কেউ যদি বারবার অপমান করেন এবং আলোচনার কোনো সুযোগ না রাখেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় তর্ক এড়িয়ে চলা যেতে পারে। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট সহায়তা ব্যবস্থার সাহায্য নেওয়া যায়।
নিজের আত্মমর্যাদা রক্ষা করা এবং প্রতিটি মানুষের অনুমোদন পাওয়ার জন্য মরিয়া হওয়া এক বিষয় নয়। আত্মমর্যাদাবান মানুষ জানেন, নিজের অবস্থান যুক্তিসংগত হলে তা শান্তভাবে প্রকাশ করা যায়; অন্যের প্রতিটি মন্তব্যের জবাব দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
মানুষের অনুমোদন পাওয়ার নেশা থেকে মুক্তি
অনেক সময় আমরা নিজেদের জীবনকে অন্যের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে বিচার করতে শুরু করি। কেউ প্রশংসা করলে নিজেকে সফল মনে হয়, কেউ উপেক্ষা করলে মনে হয় আমাদের কোনো মূল্য নেই।
এই মানসিক নির্ভরতা ধীরে ধীরে স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দেয়।
আমরা হয়তো এমন পোশাক পরতে শুরু করি, যা নিজের পছন্দের নয়। এমন মত প্রকাশ করি, যা সত্যিই আমাদের বিশ্বাস নয়। এমন সিদ্ধান্ত নিই, যা আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গে মেলে না। শুধু অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য নিজেদের প্রকৃত ইচ্ছা ও চিন্তাকে চাপা দিই।
অবশ্যই সমাজে বসবাস করতে গেলে অন্যের মতামত বিবেচনা করতে হয়। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী ও অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু পরামর্শ গ্রহণ করা এবং নিজের সমস্ত সিদ্ধান্তের জন্য অন্যের অনুমোদনের অপেক্ষা করা এক নয়।
আমাদের শিখতে হবে, অন্যের মতামত মূল্যবান হলেও নিজের বিবেক ও বিচারবুদ্ধির গুরুত্বও রয়েছে।
নিজের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখা যেতে পারে—
- আমি কি কাজটি করছি, কারণ এটি সঠিক, নাকি শুধু প্রশংসা পাওয়ার জন্য?
- অন্যরা সমর্থন না করলেও কি আমি যুক্তিসংগত সিদ্ধান্তের পাশে থাকতে পারব?
- সমালোচনা শুনে কি আমি নিজের অবস্থান যাচাই করি, নাকি শুধু নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করি?
- অন্যের সাফল্যে আমি আনন্দিত হতে পারি, নাকি সব সময় নিজের সঙ্গে তুলনা করি?
এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা ও সমালোচনার প্রভাব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে প্রশংসা ও সমালোচনা আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশ্য। একটি ছবি, ভিডিও বা পোস্টে কতজন প্রতিক্রিয়া জানালেন, কতজন প্রশংসা করলেন কিংবা কতজন বিরূপ মন্তব্য করলেন—এসব বিষয় অনেকের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে।
কেউ একটি পোস্টে প্রচুর প্রশংসা পেয়ে আত্মবিশ্বাসী বোধ করেন। আবার অন্য একটি পোস্টে কম প্রতিক্রিয়া পেলে হতাশ হয়ে পড়েন। কেউ বিরূপ মন্তব্যের কারণে নিজের কাজ বন্ধ করে দেন, আবার কেউ জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য নিজের মূল্যবোধের বিরুদ্ধেও কাজ করেন।
এখানে মনে রাখা দরকার, অনলাইনের প্রতিক্রিয়া সব সময় কোনো কাজের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে না। একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক লেখা কম মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, আবার একটি অগভীর বিষয় বিপুল জনপ্রিয়তা পেতে পারে। জনপ্রিয়তা এবং গুণমান সব সময় এক জিনিস নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার সময় তাই নিজের উদ্দেশ্য স্পষ্ট রাখা জরুরি। আমরা কি তথ্য দিতে চাই, মানুষকে সচেতন করতে চাই, সৃজনশীল কিছু প্রকাশ করতে চাই, নাকি শুধু অন্যের প্রশংসা পেতে চাই?
প্রশংসা পেলে আনন্দিত হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু নিজের মূল্যকে লাইক, শেয়ার বা মন্তব্যের সংখ্যার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
একইভাবে, সমালোচনা এলে তা পড়ে প্রয়োজনীয় অংশ বিবেচনা করা যায়। কিন্তু অপমানজনক মন্তব্যের কারণে নিজের মানসিক শান্তি সম্পূর্ণ নষ্ট করে ফেলা কিংবা প্রতিটি মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে সময় ও শক্তি ব্যয় করা সব সময় যুক্তিসংগত নয়।
শিশুদের প্রশংসা ও সমালোচনা গ্রহণ করতে শেখানো
শিশুর চরিত্র গঠনে প্রশংসা ও সমালোচনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রশংসা করার সময় শুধু ফলাফল নয়, প্রচেষ্টা, সততা এবং দায়িত্বশীল আচরণকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
একজন শিশু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলে তাকে অভিনন্দন জানানো যেতে পারে। কিন্তু শুধু নম্বরের জন্য প্রশংসা করলে সে ভাবতে পারে, ভালো ফল করাই তার একমাত্র মূল্য। তার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, “তুমি নিয়মিত চেষ্টা করেছ, নিজের ভুলগুলি বুঝে সংশোধন করেছ—এটাই খুব ভালো।”
একইভাবে, শিশু কোনো কাজে ব্যর্থ হলে তাকে অযোগ্য বলে অপমান করা উচিত নয়। বরং কোথায় অসুবিধা হয়েছে, কীভাবে আবার চেষ্টা করা যায়, তা বোঝাতে হবে।
শিশুকে শেখাতে হবে যে অন্যের সমালোচনা শুনতে হয়, কিন্তু সব কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হয় না। কেউ তার ভুল ধরিয়ে দিলে সে যেন বিষয়টি বিবেচনা করতে শেখে। আবার কেউ অন্যায়ভাবে অপমান করলে নিজের অবস্থান শান্তভাবে প্রকাশ করতেও যেন পারে।
বড়দের নিজেদের আচরণেও এই শিক্ষার প্রতিফলন থাকা দরকার। বাবা-মা যদি সামান্য সমালোচনা সহ্য করতে না পারেন, তাহলে শিশুর কাছে সমালোচনা গ্রহণের শিক্ষা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে না।
প্রশংসা ও সমালোচনার মধ্যে ভারসাম্য রাখার সাতটি অভ্যাস
১. প্রশংসা পেলে কৃতজ্ঞ থাকুন। নিজের সাফল্যে আনন্দিত হোন, কিন্তু অন্যদের অবদান ভুলে যাবেন না।
২. সমালোচনা শুনে থামুন, তারপর ভাবুন। সঙ্গে সঙ্গে রেগে যাওয়া বা আত্মপক্ষসমর্থন করার আগে বক্তব্যটি বোঝার চেষ্টা করুন।
৩. তথ্য ও আবেগকে আলাদা করুন। কেউ রাগ করে কথা বললেও তাঁর বক্তব্যে কোনো সত্য থাকতে পারে। আবার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা কথা সব সময় সত্য নয়।
৪. নিজের ভুল স্বীকার করুন। সমালোচনা যুক্তিসংগত হলে প্রয়োজনমতো নিজের আচরণ সংশোধন করুন।
৫. অন্যায় অপমানকে নিজের পরিচয় বানাবেন না। কারও নেতিবাচক মন্তব্য আপনার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বের নির্ভুল মূল্যায়ন নয়।
৬. অন্যের প্রশংসা করতেও শিখুন। অন্যের সাফল্যকে স্বীকৃতি দিলে নিজের মূল্য কমে যায় না; বরং উদারতা প্রকাশ পায়।
৭. নিজের কাজের মানকে গুরুত্ব দিন। শুধু মানুষ কী বলছে তা নয়, কাজটি কতটা সৎ, উপকারী ও দায়িত্বশীল হচ্ছে, সেটিও বিচার করুন।
এই অভ্যাসগুলি গড়ে উঠলে মানুষ প্রশংসা ও সমালোচনার দ্বারা অতিরিক্ত পরিচালিত না হয়ে নিজের বিবেকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করতে পারে।
উপসংহার: মানুষের বাহবা ক্ষণস্থায়ী, চরিত্রের মূল্য দীর্ঘস্থায়ী
প্রশংসা আমাদের আনন্দ দেয়, উৎসাহিত করে এবং কাজের স্বীকৃতি এনে দেয়। সমালোচনা কখনো কষ্ট দেয়, আবার কখনো আমাদের অজানা দুর্বলতা দেখিয়ে উন্নতির পথ খুলে দেয়। তাই প্রশংসা ও সমালোচনা—দুটিকেই বুঝে গ্রহণ করার ক্ষমতা থাকা দরকার।
যে মানুষ শুধু প্রশংসার জন্য কাজ করেন, তিনি অন্যের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। আর যে মানুষ প্রতিটি সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ মনে করেন, তিনি নিজের উন্নতির অনেক সুযোগ হারান। বিপরীতে, যে মানুষ প্রশংসা পেয়ে বিনয়ী থাকেন এবং সমালোচনা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন, তিনি ধীরে ধীরে আরও পরিণত হয়ে ওঠেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। আমরা সৎভাবে কাজ করলেও কেউ প্রশংসা করবেন, কেউ নির্লিপ্ত থাকবেন, আবার কেউ বিরোধিতা করবেন। মানুষের মতামত ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক।
তাই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে অন্যের অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা না করে নিজের বিবেক, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের ভুল থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, নিজের কাজের মূল্য বুঝতে হবে এবং অন্যায় সমালোচনার সামনে আত্মমর্যাদা বজায় রাখতে হবে।
শেষ পর্যন্ত মানুষকে বড় করে তোলে শুধু তার সাফল্য নয়, সাফল্যের সময় তার বিনয়, সমালোচনার সময় তার ধৈর্য এবং সত্যের মুখোমুখি হলে তার সততা।
প্রশংসা পেলে মাথা যেন অহংকারে উঁচু না হয়, আর সমালোচনা এলে আত্মবিশ্বাস যেন ভেঙে না পড়ে। নিজের চরিত্রকে এমনভাবে গড়ে তুলুন, যাতে মানুষের বাহবা আপনাকে আনন্দ দেয়, কিন্তু আপনার বিবেকের জায়গা দখল করতে না পারে। কারণ, মানুষের মুখের প্রশংসা একদিন থেমে যেতে পারে, কিন্তু সৎ চরিত্রের মূল্য মানুষের আচরণে, সম্পর্কের গভীরতায় এবং জীবনের সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে।