আমগাছের ছায়ায় শেষ বেঞ্চ।

সোনাঝুরি গ্রামের স্কুলটা খুব বড় ছিল না। তিনটে পাকা ঘর, একটা টিনের বারান্দা, সামনে ছোট্ট মাঠ আর মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশাল আমগাছ।

গাছটার বয়স কত, কেউ জানত না।

গ্রামের প্রবীণরা বলতেন, তাঁদের ছোটবেলাতেও গাছটা এমনই বড় ছিল।

গরমের দিনে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সেই আমগাছের নিচে বসত। দুপুরের টিফিনে কেউ গল্প করত, কেউ বই পড়ত, কেউ আবার মাটিতে কাঠি দিয়ে ছবি আঁকত।

গাছটার নিচে ছিল একটা পুরোনো কাঠের বেঞ্চ।

সেই বেঞ্চে প্রায়ই বসত তৃষা।

তৃষা ক্লাস সেভেনের ছাত্রী।

সে খুব চুপচাপ।

কিন্তু গাছপালার প্রতি তার অসম্ভব ভালোবাসা।

একদিন দুপুরে টিফিনের সময় সে দেখল, স্কুলের মাঠের পাশে কয়েকজন শ্রমিক মাপজোক করছে।

তৃষা দৌড়ে প্রধান শিক্ষক অরুণবাবুর কাছে গেল।

—“স্যার, ওরা কী করছে?”

অরুণবাবু বললেন,

—“স্কুলের নতুন ভবন হবে। মাঠের একপাশে কাজ হবে।”

তৃষা খুশি হল।

—“নতুন ঘর হবে?”

—“হ্যাঁ।”

কিন্তু তৃষার চোখ হঠাৎ আমগাছটার দিকে গেল।

সে দেখল, মাপের দাগটা গাছের খুব কাছ দিয়ে গেছে।

—“স্যার, গাছটা থাকবে তো?”

অরুণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন,

—“নকশা অনুযায়ী গাছটা কাটতে হতে পারে।”

তৃষা যেন কিছুতেই কথাটা বিশ্বাস করতে পারল না।

—“কিন্তু গাছটা তো অনেক পুরোনো!”

—“জানি।”

—“তাহলে কাটবেন কেন?”

—“নতুন ভবনের জায়গা দরকার।”

তৃষা সেইদিন আমগাছটার নিচে গিয়ে বসে রইল।

বেঞ্চটা যেন হঠাৎ খুব একা মনে হল।

পরদিন সে একটা খাতা নিয়ে এল।

পাতার ওপর লিখল—

“গাছটা কেন দরকার?”

তারপর একে একে কারণ লিখতে শুরু করল।

গরমে ছায়া দেয়।

পাখিরা বাসা বানায়।

মাটির ক্ষয় কমায়।

শিশুরা এখানে বসে।

আম হয়।

আর সবচেয়ে বড় কথা—

এটা স্কুলের স্মৃতি।

তৃষা শুধু নিজের কথা ভাবল না।

সে স্কুলের সব ছাত্রছাত্রীকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল,

—“তোমাদের কাছে এই গাছটার কী মূল্য?”

কেউ বলল,

—“আমি প্রথম এই গাছের নিচে বসেই কবিতা মুখস্থ করেছিলাম।”

কেউ বলল,

—“আমার দাদু আমাকে এখানে বসিয়ে গল্প বলতেন।”

কেউ বলল,

—“আমার টিফিনের আম ভাগ করে খেয়েছি এই গাছের নিচে।”

কেউ বলল,

—“আমার প্রথম বন্ধুও এই বেঞ্চে বসেই হয়েছিল।”

তৃষা সব লিখে রাখল।

তারপর সে একটা পোস্টার বানাল।

“নতুন ঘর চাই, পুরোনো গাছও চাই।”

পোস্টারটা স্কুলের সামনে টাঙিয়ে দিল।

কিছু ছাত্র হাততালি দিল।

কেউ বলল,

—“গাছটা বাঁচবে।”

কিন্তু সবাই খুশি হল না।

একজন বলল,

—“একটা গাছের জন্য এত কিছু করার কী আছে?”

তৃষা উত্তর দিল না।

সে জানত, শুধু আবেগ দিয়ে কাজ হবে না।

তাই সে বিজ্ঞান বই খুলল।

গাছ কীভাবে পরিবেশে ভূমিকা রাখে, তা পড়ল।

শিক্ষকের সাহায্যে একটা ছোট প্রতিবেদন তৈরি করল।

তারপর স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

—“আমরা নতুন ভবনের বিরোধিতা করছি না। আমরা শুধু চাই, নকশাটা যদি সম্ভব হয় একটু বদলে গাছটাকে রাখা হোক।”

প্রধান শিক্ষক বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে দেখলেন।

তিনি নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা বললেন।

ইঞ্জিনিয়ার এসে গাছটা দেখে বললেন,

—“ভবনটা একটু ঘুরিয়ে দিলে গাছটা রাখা সম্ভব।”

কিন্তু তাতে খরচ কিছুটা বাড়বে।

তৃষা বলল,

—“আমরা কি অন্যভাবে খরচ কমাতে পারি?”

ইঞ্জিনিয়ার অবাক।

—“তুমি কীভাবে করবে?”

তৃষা বলল,

—“স্কুলের পুরোনো কিছু জিনিস পুনর্ব্যবহার করা যায় কি না দেখুন। আর গাছটার চারপাশের জায়গা আমরা নিজেরা পরিষ্কার করে দেব।”

প্রধান শিক্ষক হাসলেন।

—“চেষ্টা করে দেখা যাক।”

শিক্ষকরা, অভিভাবক আর ছাত্রছাত্রীরা মিলে কাজ শুরু করল।

পুরোনো ইট পরিষ্কার করা হল।

অপ্রয়োজনীয় কাঠ সরানো হল।

গাছের চারপাশে জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করা হল।

শেষ পর্যন্ত নতুন ভবনের নকশায় সামান্য পরিবর্তন আনা হল।

আমগাছটা রয়ে গেল।

নতুন ভবনের কাজ শুরু হল।

তবে কাজ শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগল।

এই সময়ে তৃষা আর একটা কাজ শুরু করল।

সে স্কুলের প্রতিটি ছাত্রকে একটা করে চারা লাগাতে বলল।

স্কুলের মাঠের চারপাশে ছোট ছোট চারা লাগানো হল।

কেউ নিম।

কেউ কৃষ্ণচূড়া।

কেউ জাম।

কেউ পেয়ারা।

তৃষা বলল,

—“আজ যে গাছটা বাঁচালাম, তার পাশে আগামী দিনের গাছও লাগাতে হবে।”

শিক্ষকরা সেই উদ্যোগের নাম দিলেন—

“ছায়ার উত্তরাধিকার।”

বছর পেরিয়ে গেল।

তৃষা বড় হল।

স্কুল শেষ করল।

শহরে পড়তে চলে গেল।

তারপর চাকরিও পেল অন্য শহরে।

কিন্তু বহু বছর পর একদিন সে আবার সোনাঝুরি গ্রামে ফিরল।

স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সে অবাক হয়ে গেল।

পুরোনো আমগাছটা এখনও আছে।

কিন্তু এবার সে একা নয়।

তার চারপাশে আরও অনেক গাছ।

যে চারাগুলো তৃষা একদিন ছোট হাতে লাগিয়েছিল, সেগুলো এখন বড় হয়েছে।

মাঠের পাশে একটা নতুন বেঞ্চ।

তৃষা সেখানে বসে পড়ল।

একজন বৃদ্ধ শিক্ষক এসে দাঁড়ালেন।

তৃষা চিনতে পারল না।

লোকটি হাসলেন।

—“আমাকে চিনতে পারছ না?”

তৃষা তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ চিনতে পারল।

—“অরুণ স্যার!”

স্যার হাসলেন।

—“অনেক বছর পর এলি।”

তৃষার চোখ চলে গেল আমগাছটার দিকে।

—“গাছটা আছে।”

অরুণবাবু বললেন,

—“শুধু গাছটা নয়।”

তিনি চারপাশ দেখালেন।

—“তুই যে চারাগুলো লাগিয়েছিলি, সেগুলোও আছে।”

তৃষা চুপ করে গেল।

একদল ছোট ছেলে-মেয়ে দৌড়ে এসে গাছের নিচে বসে পড়ল।

তাদের মধ্যে একজন বলল,

—“দিদি, আপনি এখানে বসবেন?”

তৃষা হেসে বলল,

—“হ্যাঁ।”

ছেলেটা জিজ্ঞেস করল,

—“এই বেঞ্চটা কার?”

অরুণবাবু বললেন,

—“এই বেঞ্চটা অনেকের।”

তৃষা অবাক হয়ে তাকাল।

স্যার বললেন,

—“যে ছাত্রছাত্রী এখানে বসে স্বপ্ন দেখেছে, সবার।”

বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল।

আমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো বেঞ্চের ওপর পড়ছিল।

তৃষা হাত বাড়িয়ে গাছের কাণ্ড ছুঁয়ে বলল,

—“তুমি এখনও দাঁড়িয়ে আছ।”

মনে হল, গাছটা যেন পাতার শব্দে উত্তর দিল।

“তুমিও তো দাঁড়িয়ে আছ।”

তৃষা মৃদু হেসে ফেলল।

সে বুঝল, কোনো ভালো কাজের ফল সবসময় সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না।

কখনও একটা সিদ্ধান্তের ফল দেখতে দশ বছর লাগে।

কখনও বিশ বছর।

কখনও তারও বেশি।

কিন্তু একটা গাছ বাঁচানো মানে শুধু একটা গাছকে বাঁচানো নয়।

তার ছায়ায় যারা একদিন বসবে—

তাদের ভবিষ্যতের জন্যও একটু জায়গা রেখে যাওয়া।

সেদিন স্কুল ছাড়ার আগে তৃষা শেষবারের মতো বেঞ্চটায় বসল।

তার সামনে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলছে।

মাথার ওপর বিশাল আমগাছ।

আর চারপাশে নতুন সবুজ।

তৃষা মনে মনে বলল—

“একদিন আমিও এই বেঞ্চে বসে স্বপ্ন দেখেছিলাম। আজ দেখি, সেই স্বপ্নের ছায়া এখনও আছে।”

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *