শীতের আগমন প্রকৃতিকে যেমন নতুন রূপে সাজিয়ে তোলে, তেমনই এই সময়ে বয়স্ক মানুষদের স্বাস্থ্যের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। তাপমাত্রা কমে যাওয়া, ঠান্ডা বাতাস, কুয়াশা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পরিবর্তন প্রবীণদের জন্য কিছু শারীরিক সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, হাঁপানি বা হাড়ের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের সতর্ক থাকা জরুরি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শারীরিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে শীতকালে সামান্য অসতর্কতাও কখনও কখনও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ওষুধ, উপযুক্ত পোশাক, নিরাপদ শরীরচর্চা এবং পরিবারের সহযোগিতার মাধ্যমে বয়স্কদের সুস্থ ও স্বচ্ছন্দ রাখা সম্ভব।
১. ঠান্ডা থেকে শরীরকে সুরক্ষিত রাখুন
শীতকালে বয়স্কদের শরীর গরম রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভোরবেলা এবং সন্ধ্যার পরে তাপমাত্রা কমে গেলে বাইরে যাওয়ার সময় উপযুক্ত গরম পোশাক ব্যবহার করা উচিত।
একাধিক হালকা পোশাক পরলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলি খোলা বা পরা যায়। ঠান্ডা বেশি থাকলে মোজা, আরামদায়ক জুতো, টুপি ও চাদর ব্যবহার করতে পারেন। বাড়ির ভিতরেও ঘর যেন অতিরিক্ত ঠান্ডা না থাকে, সেদিকে নজর দিন।
ভিজে পোশাক পরে থাকা এড়িয়ে চলুন। ঠান্ডা লাগলে দ্রুত শুকনো পোশাক পরুন। ঘর গরম করার জন্য বন্ধ ঘরে কয়লা, কাঠ বা অন্য কোনও জ্বালানি পুড়িয়ে ব্যবহার করবেন না, কারণ এতে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হতে পারে।
২. রক্তচাপের দিকে বিশেষ নজর দিন
শীতকালে ঠান্ডার প্রভাবে রক্তনালি সংকুচিত হতে পারে। এর ফলে কিছু মানুষের রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। যাঁদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাঁদের নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
বাড়িতে রক্তচাপ মাপার যন্ত্র থাকলে সঠিক পদ্ধতিতে মাপুন। মাপার আগে কয়েক মিনিট শান্তভাবে বসে থাকুন এবং হাতকে হৃদ্যন্ত্রের সমতলে রাখুন। একবারের মাপ দেখে নিজে থেকে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করবেন না।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, আচার, প্যাকেটজাত নোনতা খাবার এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া ভালো।
রক্তচাপ খুব বেশি পাওয়া গেলে, বিশেষ করে সঙ্গে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, তীব্র মাথাব্যথা, দৃষ্টির সমস্যা বা শরীরের একদিকে দুর্বলতা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিন।
৩. হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখুন
শীতের সময় কিছু মানুষের হৃদ্রোগজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ঠান্ডায় রক্তনালি সংকুচিত হওয়া এবং শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়া এর অন্যতম কারণ হতে পারে। তাই যাঁদের আগে থেকেই হৃদ্রোগ রয়েছে, তাঁদের বাড়তি সতর্ক থাকা উচিত।
সকালে খুব ঠান্ডার মধ্যে হঠাৎ দ্রুত হাঁটা বা কঠিন ব্যায়াম শুরু করবেন না। প্রথমে ঘরের মধ্যে হালকা নড়াচড়া করে শরীরকে প্রস্তুত করুন। বাইরে হাঁটতে গেলে আবহাওয়া অনুকূল কি না, তা বিবেচনা করুন।
খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ এবং পরিমিত স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার রাখুন। অতিরিক্ত লবণ, তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করুন।
বুকে চাপ বা ব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা কিংবা হঠাৎ দুর্বলতা দেখা দিলে অবহেলা করবেন না। এগুলি হৃদ্রোগের জরুরি লক্ষণ হতে পারে। অবিলম্বে চিকিৎসা নিন।
৪. হাঁটু ও জয়েন্টের ব্যথা সামলান
শীতকালে অনেক বয়স্ক মানুষ হাঁটু, কোমর, কাঁধ বা অন্যান্য জয়েন্টে ব্যথা ও শক্তভাব বেশি অনুভব করেন। ঠান্ডা আবহাওয়া কিছু মানুষের ব্যথার অনুভূতি বাড়াতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই অভিজ্ঞতা হয় না।
সকালে বিছানা থেকে ওঠার আগে হাত-পা ধীরে ধীরে নাড়াচাড়া করুন। ব্যথা না বাড়লে হালকা স্ট্রেচিং এবং অল্প সময় হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখুন।
জয়েন্টে আরাম পেতে হালকা উষ্ণ সেঁক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে খুব গরম জলের ব্যাগ সরাসরি ত্বকে লাগাবেন না। যাঁদের ডায়াবেটিসের কারণে অনুভূতি কমে গেছে বা ত্বকে অসাড়তা রয়েছে, তাঁদের বিশেষ সতর্ক থাকা দরকার।
ব্যথা হঠাৎ বেড়ে গেলে, জয়েন্ট ফুলে লাল হয়ে গেলে, জ্বর হলে বা হাঁটাচলা অসম্ভব হয়ে পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
৫. পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের ক্ষুধা কমে যায়। দাঁতের সমস্যা, হজমের অসুবিধা বা একাকিত্বের কারণেও খাবার খাওয়ার আগ্রহ কমতে পারে। এর ফলে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফল, আঁশ এবং প্রয়োজনীয় খনিজ রাখুন। ডিম, মাছ, ডাল, দুধ, দই ও উপযুক্ত বিকল্প থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একবারে বেশি খাবার খেতে অসুবিধা হলে অল্প পরিমাণে একাধিকবার খেতে পারেন। তবে ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ বা অন্য কোনও দীর্ঘস্থায়ী অসুখ থাকলে খাদ্যতালিকা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী তৈরি করা ভালো।
৬. পর্যাপ্ত জল পান করুন
শীতকালে তৃষ্ণা কম অনুভূত হওয়ায় অনেক বয়স্ক মানুষ পর্যাপ্ত জল পান করেন না। এর ফলে শরীরে জলীয় ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
দিনভর নিয়মিত জল পান করুন। সাধারণ জল বা হালকা উষ্ণ জল খেতে পারেন। পাশাপাশি স্যুপ ও অন্যান্য তরল খাবারও উপকারী হতে পারে।
তবে যাঁদের হৃদ্যন্ত্র বা কিডনির সমস্যার কারণে চিকিৎসক তরল গ্রহণের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁরা সেই নির্দেশ মেনে চলুন। অতিরিক্ত জল পান করাও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হতে পারে।
৭. নিরাপদে হাঁটাচলা ও শরীরচর্চা করুন
বয়স্কদের সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটা, সহজ স্ট্রেচিং এবং ভারসাম্য বজায় রাখার অনুশীলন দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন অল্প সময় হাঁটা দিয়ে শুরু করুন। বাড়ির ভিতরে হাঁটার নিরাপদ জায়গা তৈরি করুন। মেঝেতে জল, আলগা কার্পেট, তার বা অন্যান্য বাধা যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করুন।
বাইরে কুয়াশা বেশি থাকলে বা রাস্তা পিচ্ছিল হলে বাইরে হাঁটতে না যাওয়াই ভালো। প্রয়োজনে পরিবারের কাউকে সঙ্গে নিন। হাঁটার সময় বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে থামুন এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হলে দ্রুত সাহায্য নিন।
৮. সংক্রমণ প্রতিরোধে সতর্ক থাকুন
বয়স্কদের ক্ষেত্রে কিছু শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। তাই নিয়মিত হাত ধোয়া, কাশি-হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং অসুস্থ মানুষের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন। জ্বর, কাশি বা সর্দি হলে বিশ্রাম নিন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ইনফ্লুয়েঞ্জা, কোভিড-১৯ বা বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার জন্য প্রাসঙ্গিক অন্যান্য টিকা সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন। টিকা সংক্রমণের সব ঝুঁকি দূর না করলেও নির্দিষ্ট রোগের গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
৯. ওষুধ ও নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা অবহেলা করবেন না
অনেক বয়স্ক মানুষকে প্রতিদিন একাধিক ওষুধ খেতে হয়। শীতের সময়ও ওষুধের নিয়মিত সময়সূচি বজায় রাখা জরুরি।
ওষুধের নাম, মাত্রা ও খাওয়ার সময় লিখে রাখুন। সম্ভব হলে ওষুধের তালিকা পরিবারের কোনও সদস্যের কাছেও রাখুন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও ওষুধ বন্ধ করবেন না বা মাত্রা পরিবর্তন করবেন না।
নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার মাধ্যমে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসূচক পর্যবেক্ষণ করুন। নতুন কোনও ওষুধ খাওয়ার আগে চলতি ওষুধগুলির কথা চিকিৎসককে জানান, কারণ কিছু ওষুধের পারস্পরিক প্রভাব থাকতে পারে।
১০. মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও যত্নশীল হোন
শীতকালে ঠান্ডা বা শারীরিক সমস্যার কারণে অনেক বয়স্ক মানুষ বাড়ির বাইরে কম বেরোন। ফলে কারও কারও একাকিত্ব, মন খারাপ বা মানসিক অবসাদ বাড়তে পারে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটান। বন্ধু বা আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলুন। বই পড়া, গান শোনা, বাগান করা কিংবা নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়া মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে।
পরিবারের সদস্যদেরও উচিত প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, আগ্রহ কমে যাওয়া বা ঘুমের সমস্যা দেখা দিলে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
উপসংহার
শীতকালে বয়স্কদের সুস্থ রাখতে পরিবারের সহযোগিতা, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনে সামান্য সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত গরম পোশাক, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত জল, নিরাপদ শরীরচর্চা এবং চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলার মাধ্যমে অনেক সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তবে সবার স্বাস্থ্যগত অবস্থা এক নয়। তাই অন্যের পরামর্শে ওষুধ পরিবর্তন না করে নিজের চিকিৎসকের নির্দেশ অনুসরণ করুন। কোনও গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
বয়স্কদের যত্ন নেওয়া মানে শুধু তাঁদের রোগ থেকে রক্ষা করা নয়; তাঁদের নিরাপত্তা, মানসিক শান্তি, আত্মসম্মান এবং স্বাধীনতাকেও গুরুত্ব দেওয়া। পরিবারের ভালোবাসা, সচেতনতা ও সঠিক স্বাস্থ্যপরিচর্যা শীতের দিনগুলিকে তাঁদের জন্য আরও নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও আনন্দময় করে তুলতে পারে।












Leave a Reply