শহরের এক প্রান্তে ছিল পুরোনো একটি ডাকঘর। লাল রঙের দেওয়াল, কাঠের জানলা আর সামনের ছোট্ট বারান্দা—সব মিলিয়ে জায়গাটির মধ্যে এক অদ্ভুত শান্তি ছিল। একসময় এই ডাকঘরে প্রতিদিন শত শত চিঠি আসত। এখন বেশির ভাগ খবরই মোবাইল ফোনে পৌঁছে যায়। তবু ডাকঘরটি চালু ছিল, আর তার প্রবীণ কর্মী নিত্যানন্দবাবু প্রতিটি চিঠিকে এখনও বিশেষ যত্নে দেখতেন।
এক বর্ষার সকালে ডাকঘরের ছাঁটাইয়ের টেবিলে একটি খাম এসে পড়ল। খামের ওপর প্রাপকের নাম লেখা ছিল—‘আমার ছোট ভাই’। ঠিকানার জায়গায় লেখা, ‘যেখানে সে নিজের মতো করে বাঁচতে শিখেছে।’
চিঠিটি পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় ঠিকানা না থাকায় সেটি অন্য চিঠির সঙ্গে পাঠানো সম্ভব ছিল না। নিত্যানন্দবাবু খামটি খুললেন না। তিনি জানতেন, চিঠির ভিতরের কথা ব্যক্তিগত হতে পারে। কিন্তু খামের ওপর লেখা কথাগুলো তাঁর মনে কৌতূহল জাগাল।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রাপকের ঠিকানা না থাকলে চিঠি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু খামের উল্টো দিকে প্রেরকের নামও ছিল না। শুধু ছোট্ট করে লেখা, ‘অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগে।’
নিত্যানন্দবাবু চিঠিটি আলাদা করে রাখলেন। কয়েক দিন পরে পুরোনো নথি গুছিয়ে রাখার সময় তাঁর সহকর্মী মধুমিতা খামটি দেখতে পেলেন।
“এটা কী, কাকু?”
“ঠিকানাহীন চিঠি। নিয়ম মেনে ব্যবস্থা করতে হবে।”
মধুমিতা খামের ওপরের লেখাটি পড়ে বললেন, “হয়তো কেউ নিজের ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাইতে চাইছে।”
নিত্যানন্দবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “হতে পারে। কিন্তু অনুমান করে তো চিঠি পৌঁছে দেওয়া যায় না।”
পরদিন ডাকঘরে এল এক তরুণ, নাম ঋত্বিক। সে একটি পার্সেল পাঠাতে এসেছিল। কাউন্টারে অপেক্ষা করতে করতে তার চোখ পড়ল দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো ডাকঘরের ছবিতে। ছবিটির দিকে তাকিয়ে সে বলল, “এই ডাকঘরেই আমার বাবা কাজ করতেন। ছোটবেলায় আমাকে এখানে নিয়ে আসতেন।”
নিত্যানন্দবাবু ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “তোমার বাবার নাম কী?”
“সুশান্ত মিত্র। বছর দশেক আগে অবসর নিয়েছেন।”
নিত্যানন্দবাবু নামটি চিনতে পারলেন। সুশান্তবাবু ছিলেন তাঁর বহু দিনের সহকর্মী। তবে তিনি জানতেন, সুশান্তবাবুর দুই ছেলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক ভালো ছিল না। বড় ছেলে ঋত্বিক চাকরির জন্য অন্য শহরে চলে গিয়েছিল। ছোট ছেলে অয়ন পরিবারের সঙ্গে থাকলেও পরে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। দুই ভাইয়ের মধ্যে কী নিয়ে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা নিত্যানন্দবাবু জানতেন না।
ঋত্বিক চলে যাওয়ার পর নিত্যানন্দবাবু খামটির কথা আবার ভাবলেন। কিন্তু শুধুমাত্র নামের মিলের ভিত্তিতে চিঠিটি তার হাতে তুলে দেওয়া ঠিক হবে না। প্রাপকের পরিচয় নিশ্চিত না করে কোনও ব্যক্তিগত চিঠি দেওয়া যায় না।
কয়েক সপ্তাহ পরে ডাকঘরে সুশান্তবাবু নিজেই এলেন। তিনি কিছু পুরোনো কাগজের খোঁজ করছিলেন। কথা বলতে বলতে জানালেন, ছোট ছেলে অয়নের সঙ্গে তাঁর বহু বছর যোগাযোগ নেই। একসময় রাগের মাথায় তিনি ছেলেকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেছিলেন। পরে অনুতাপ হলেও কীভাবে সম্পর্ক ঠিক করবেন, বুঝতে পারেননি।
নিত্যানন্দবাবু মন দিয়ে শুনলেন। কিন্তু ঠিকানাহীন চিঠির কথা বললেন না। তিনি জানতেন, চিঠির প্রাপক কে, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। আর চিঠির ব্যক্তিগত বিষয় জানার অধিকারও তাঁর নেই।
সুশান্তবাবু চলে যাওয়ার পর মধুমিতা বললেন, “কাকু, আপনি কি মনে করেন চিঠিটা অয়নের জন্য?”
“মনে হতে পারে,” নিত্যানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু মনে হওয়া আর নিশ্চিত হওয়া এক কথা নয়।”
এর কয়েক দিন পর ডাকঘরে এলেন এক মধ্যবয়স্ক মহিলা। তিনি জানালেন, তাঁর ভাই অয়ন বহু বছর আগে এই শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। তিনি ভাইকে একটি চিঠি পাঠাতে চান, কিন্তু সঠিক ঠিকানা জানেন না। শুধু জানেন, ভাই এখন অন্য শহরে একটি ছোট ছাপাখানায় কাজ করেন।
মহিলার নাম ছিল শর্মিষ্ঠা। কথায় কথায় জানা গেল, অয়ন ও ঋত্বিকের মধ্যে নয়, বরং অয়ন ও বাবার মধ্যে বহু দিনের অভিমান জমে ছিল। শর্মিষ্ঠা বললেন, “ভাইয়ের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক ঠিক করতে চাই। কিন্তু বাবা মুখে কিছু বলতে পারেন না। আমি চাই, অন্তত একটা চিঠি দিয়ে শুরু হোক।”
নিত্যানন্দবাবু তাঁকে ঠিকানা সংগ্রহের উপায় বুঝিয়ে দিলেন। তিনি কোনও পুরোনো চিঠি খুললেন না, কোনও গোপন তথ্য প্রকাশ করলেন না। শুধু বললেন, “যার কাছে চিঠি পাঠাতে চান, তাঁর বর্তমান ঠিকানা নিশ্চিত করার চেষ্টা করুন। আর চিঠিতে যা বলতে চান, নিজের ভাষায় বলুন। সম্পর্ক মেরামত করার জন্য নিখুঁত বাক্যের দরকার হয় না।”
শর্মিষ্ঠা কয়েক দিন পরে ফিরে এলেন। এবার তাঁর হাতে ছিল একটি নতুন খাম, প্রাপকের সম্পূর্ণ ঠিকানা লেখা। তিনি নিজেই চিঠিটি পোস্ট করলেন।
নিত্যানন্দবাবু সেই চিঠি ছাঁটাইয়ের ঝুড়িতে রাখলেন। তাঁর মনে হলো, এই চিঠি ঠিকানায় পৌঁছবে কি না, তার চেয়েও বড় কথা হলো—কেউ অবশেষে নিজের অভিমান সরিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছে।
কয়েক মাস পরে সুশান্তবাবু আবার ডাকঘরে এলেন। তাঁর মুখে দীর্ঘদিন পর হাসি। তিনি জানালেন, অয়নের কাছ থেকে উত্তর এসেছে। প্রথমে ছোট্ট একটি চিঠি, তারপর ফোনে কথা। এখনো সব অভিমান মুছে যায়নি, কিন্তু বহু বছরের নীরবতা ভাঙতে শুরু করেছে।
নিত্যানন্দবাবু জানলার বাইরে বৃষ্টিভেজা রাস্তার দিকে তাকালেন। তিনি ভাবলেন, ডাকঘরের কাজ শুধু কাগজকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেওয়া নয়। মানুষের বলা না-হওয়া কথাগুলোর জন্যও কখনও কখনও একটি পথ তৈরি করে দেওয়া।
সেই ঠিকানাহীন চিঠিটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়েছিল, তা তিনি কখনও জানতে পারেননি। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, প্রতিটি চিঠির ঠিকানা খামের ওপর লেখা থাকে না। কিছু ঠিকানা খুঁজে পেতে মানুষের নিজের হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়তে হয়।
শিক্ষা: অভিমান দীর্ঘদিন জমিয়ে রাখলে সম্পর্ক দূরে সরে যায়। ক্ষমা চাওয়া বা কথা শুরু করার জন্য সব সময় নিখুঁত মুহূর্তের অপেক্ষা করতে নেই—সৎভাবে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়াই অনেক সময় নতুন সম্পর্কের শুরু।












Leave a Reply