শহরের একটি ব্যস্ত হাসপাতালে কাজ করতেন ডা. ইরা সেন। চিকিৎসক হিসেবে তিনি দক্ষ ছিলেন, কিন্তু তাঁর একটি অভ্যাস নিয়ে সহকর্মীরা প্রায়ই হাসাহাসি করতেন। কোনও রোগীকে দেখার আগে তিনি শুধু রোগের লক্ষণ জানতে চাইতেন না, জিজ্ঞেস করতেন, “আপনার জীবনে সম্প্রতি এমন কী ঘটেছে, যা আপনাকে চিন্তায় রেখেছে?”
অনেকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাইতেন না। কেউ বলতেন, “ডাক্তার, আমার শুধু মাথাব্যথা।” কেউ আবার বিরক্ত হয়ে জানাতেন, “এসব ব্যক্তিগত কথা চিকিৎসার সঙ্গে কী সম্পর্ক?”
ইরা কাউকে জোর করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের শরীর ও মনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ওষুধের পাশাপাশি রোগীর জীবনযাপনের কথাও জানা জরুরি।
একদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে এলেন এক বৃদ্ধ, নাম বিমলবাবু। তাঁর অভিযোগ—গত কয়েক মাস ধরে বুক ধড়ফড় করে, রাতে ঘুম হয় না, মাঝে মাঝে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে গিয়েও স্থায়ী সমাধান পাননি।
ইরা তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখলেন। তৎক্ষণাৎ কোনও গুরুতর শারীরিক সমস্যার প্রমাণ পাওয়া গেল না, তবে উপসর্গগুলোকে অবহেলা করারও উপায় ছিল না। তিনি আরও কিছু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিলেন এবং বললেন, “আপনি কি ইদানীং খুব দুশ্চিন্তায় থাকেন?”
বিমলবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “আমার বয়স হয়েছে, শরীর খারাপ হবে। দুশ্চিন্তার কথা বলে কী হবে?”
ইরা আর প্রশ্ন করলেন না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তাঁকে পরে আবার দেখা করতে বললেন।
দু’সপ্তাহ পরে বিমলবাবু ফিরলেন। পরীক্ষার ফল দেখে চিকিৎসা পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হলো। তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছু উন্নতি হলেও রাতের অস্থিরতা কমেনি। এবার ইরা শুধু বললেন, “আপনি চাইলে আমাকে আপনার কথা বলতে পারেন। আমি শুনব।”
বিমলবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
ছয় মাস আগে তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন। বিয়ের পঞ্চাশ বছরের জীবনে তাঁরা কখনও আলাদা থাকেননি। স্ত্রীই তাঁর ওষুধের সময় মনে করিয়ে দিতেন, খাবার সাজিয়ে দিতেন, সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে গল্প করতেন। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর বাড়িটি একই রকম থাকলেও সবকিছু যেন অর্থহীন হয়ে পড়েছে।
ছেলে অন্য শহরে চাকরি করে। সে নিয়মিত ফোন করে, কিন্তু বিমলবাবু নিজের কষ্টের কথা বলতে পারেন না। তিনি মনে করেন, দুঃখের কথা বললে ছেলে চিন্তায় পড়বে। তাই ফোনে সব সময় বলেন, “আমি ভালো আছি।”
কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ ভিজে উঠল।
“ডাক্তার, আমি কি খুব দুর্বল হয়ে পড়েছি? এত বয়স হয়েছে, তবু স্ত্রীকে ভুলতে পারছি না।”
ইরা শান্তভাবে বললেন, “প্রিয় মানুষকে হারানোর কষ্ট দুর্বলতা নয়। আপনার জীবনে তিনি যে জায়গা জুড়ে ছিলেন, তা এক দিনে শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা নয়। তবে এই কষ্ট নিয়ে আপনাকে একা থাকতে হবে, এমনও নয়।”
তিনি বিমলবাবুকে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিলেন। পাশাপাশি নিয়মিত ঘুম, খাবার, হালকা শরীরচর্চা এবং পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়ে আলোচনা করলেন। তিনি এটাও স্পষ্ট করে দিলেন যে বুক ধড়ফড় বা শ্বাসকষ্ট বাড়লে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে; সব উপসর্গকে শুধু দুশ্চিন্তার ফল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বিমলবাবু প্রথমে দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু ইরার কথায় তিনি সাহায্য নিতে রাজি হলেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসা ও পরামর্শ চলল। ধীরে ধীরে তিনি নিজের দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তন আনলেন। সকালে কাছের পার্কে হাঁটতে শুরু করলেন। পাশের বাড়ির এক প্রবীণ বন্ধুর সঙ্গে দাবা খেলতেন। ছেলের ফোন এলে শুধু “ভালো আছি” না বলে নিজের মনের কথাও বলতে লাগলেন।
একদিন তিনি ইরার কাছে এসে বললেন, “জানেন ডাক্তার, এত দিন ভাবতাম আমার সমস্যার উত্তর একটা ওষুধের মধ্যে লুকিয়ে আছে। এখন বুঝছি, আমার কথা শোনার মতো একজন মানুষও দরকার ছিল।”
ইরা মৃদু হেসে বললেন, “কথা বলা সব সমস্যার সমাধান নয়, কিন্তু অনেক সময় সমাধানের পথে প্রথম দরজাটা খুলে দেয়।”
বিমলবাবু চলে যাওয়ার পর ইরার সহকর্মী তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি এত সময় রোগীদের কথা শোনেন কীভাবে? এতে তো কাজের চাপ বাড়ে।”
ইরা বললেন, “রোগীর কথা শোনা মানে শুধু সময় দেওয়া নয়। কখনও কখনও সেই কথার মধ্যেই এমন তথ্য থাকে, যা চিকিৎসাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। আর সব কষ্টের জন্য ওষুধ যথেষ্ট নয়—কিছু কষ্টের পাশে মানুষকেও দাঁড়াতে হয়।”
সেদিন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ইরা ভাবলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই তাঁকে রোগের লক্ষণ চিনতে শিখিয়েছে, কিন্তু প্রতিটি মানুষের গল্প তাঁকে নতুন করে মানুষকে বুঝতে শেখায়।
তিনি জানতেন, সব রোগী তাঁর কাছে মনের কথা খুলে বলবেন না। তবু তিনি প্রশ্ন করা বন্ধ করবেন না। কারণ কখনও কখনও একটি আন্তরিক প্রশ্নের পরেই মানুষ প্রথমবার নিজের কষ্টের নাম খুঁজে পায়।
শিক্ষা: মানুষের কষ্ট সব সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। সহানুভূতি দিয়ে কথা শোনা, প্রয়োজনীয় সাহায্যের পথ দেখানো এবং শরীর ও মনের যত্নকে সমান গুরুত্ব দেওয়া—এসবই মানবিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।












Leave a Reply