বসন্তপুরের ছোট্ট শহরে থাকত তৃষা। সে খুব ভালো ছবি আঁকত, কিন্তু নিজের আঁকা কাউকে দেখাতে চাইত না। স্কুলের খাতার শেষ পাতায়, পুরোনো ক্যালেন্ডারের পেছনে, কখনও আবার খবরের কাগজের ফাঁকা জায়গায় সে ছবি আঁকত। ছবিগুলো ছিল অদ্ভুত—কোথাও জানলাহীন বাড়ি, কোথাও মুখহীন মানুষ, কোথাও আবার একটি বিশাল আকাশের নিচে একা দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়ে।
তৃষার বাবা ছিলেন একজন হিসাবরক্ষক। তিনি চাইতেন মেয়ে পড়াশোনায় ভালো ফল করুক এবং ভবিষ্যতে একটি নিরাপদ চাকরি পাক। ছবি আঁকার কথা উঠলেই তিনি বলতেন, “শখ ভালো, কিন্তু শুধু ছবি এঁকে জীবন চলে না।”
তৃষা বাবার কথার প্রতিবাদ করত না। সে জানত, বাবা সংসারের জন্য অনেক পরিশ্রম করেন। তাই নিজের স্বপ্নটাকে চুপচাপ বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখত।
একদিন স্কুলে ঘোষণা হলো, জেলা স্তরে একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা হবে। বিষয়—‘আমার দেখা আগামী দিনের পৃথিবী’। সেরা ছবিগুলো একটি প্রদর্শনীতে রাখা হবে।
বন্ধুদের অনুরোধে তৃষা নাম লেখাল। কিন্তু বাড়িতে এসে আঁকা শুরু করেও বারবার থেমে গেল। সে কী আঁকবে? এমন কিছু, যা অন্যদের চোখে সুন্দর লাগবে, নাকি এমন কিছু, যা সত্যিই তার মনের কথা বলে?
সেই সন্ধ্যায় বাড়ির পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে সে একটি নীল খাম পেল। খামের মধ্যে ছিল কয়েকটি পুরোনো কাগজ এবং ছোট্ট একটি চিঠি। চিঠিটি তার মায়ের লেখা। তৃষার মা মারা গিয়েছিলেন যখন সে খুব ছোট। মায়ের হাতের লেখা সে আগে কখনও দেখেনি।
চিঠির শেষে লেখা ছিল সাতটি শব্দ—
“নিজের আলোকে লুকিয়ে রেখো না, তৃষা।”
চিঠিতে আর কোনও উপদেশ ছিল না। মা কেন কথাগুলো লিখেছিলেন, তৃষা জানত না। হয়তো মেয়ের কোনও পুরোনো ছবির পাশে বসে, হয়তো কোনও এক সাধারণ সন্ধ্যায় কথাগুলো লিখেছিলেন। কিন্তু সাতটি শব্দ তৃষার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
পরদিন সে নতুন কাগজ নিয়ে বসল। অনেকক্ষণ ভেবে সে একটি ছবি আঁকল। ছবিতে ছিল একটি বিশাল শহর। উঁচু উঁচু বাড়ির জানলা বন্ধ, রাস্তায় মানুষ ছুটছে, আকাশের রং ধূসর। শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি ছোট্ট মেয়ে হাতে একটি প্রদীপ ধরে আছে। প্রদীপের আলোয় আশপাশের বন্ধ জানলাগুলো ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। প্রতিটি জানলার ভিতরে দেখা যাচ্ছে আলাদা আলাদা দৃশ্য—কেউ গান গাইছে, কেউ বই পড়ছে, কেউ গাছ লাগাচ্ছে, কেউ অন্যের হাত ধরে আছে।
ছবিটির নাম দিল ‘আলো ভাগ করলে কমে না’।
প্রতিযোগিতার দিন তৃষা ছবিটি জমা দিল। বিচারকেরা ছবিটি দেখে প্রশংসা করলেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটল প্রদর্শনীর দিন।
একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা ছবিটির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর তৃষাকে কাছে ডেকে বললেন, “তুমি কি জানো, এই ছবিটা দেখে আমার কী মনে হচ্ছে? আমি অনেক বছর ধরে গান শেখাতাম। সংসারের চাপে সব ছেড়ে দিয়েছি। তোমার ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে, হয়তো আবার শুরু করতে পারি।”
তৃষা অবাক হয়ে মহিলার কথা শুনল। একটু পরেই এক কিশোর এসে বলল, “আমি লেখালিখি করি, কিন্তু কাউকে দেখাই না। তোমার ছবিটা দেখে মনে হলো, আমারও চেষ্টা করা উচিত।”
সেদিন তৃষা বুঝতে পারল, তার ছবির মূল্য শুধু রং বা রেখার নিখুঁত ব্যবহারে নয়। ছবিটি অন্য মানুষের মনে এমন কিছু জাগিয়ে তুলেছে, যা তারা নিজেরাই ভুলে গিয়েছিল।
তৃষা প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় পুরস্কার পেল। বাড়ি ফিরে বাবাকে শংসাপত্রটি দেখাল। বাবা প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ছবিটি মন দিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, “আমি ভাবতাম, ছবি আঁকা শুধু তোমার শখ। আজ বুঝলাম, তোমার আঁকা অন্যের মনেও আলো জ্বালাতে পারে।”
তিনি মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, “তুমি আঁকা চালিয়ে যাও। পড়াশোনাও করবে, নিজের স্বপ্নটাকেও বাঁচিয়ে রাখবে।”
সেদিন রাতে তৃষা মায়ের চিঠিটি আবার পড়ল। নীল খামটি যত্ন করে একটি বাক্সে রেখে দিল। সে জানত না, মা ভবিষ্যতের কথা ভেবে চিঠিটি লিখেছিলেন কি না। কিন্তু মায়ের সাতটি শব্দ তাকে এমন এক সাহস দিয়েছিল, যা সে আগে নিজের মধ্যে খুঁজে পায়নি।
এরপর থেকে তৃষা নিয়মিত ছবি আঁকত। সে শুধু সুন্দর দৃশ্য আঁকত না; মানুষের অদেখা অনুভূতি, ছোট ছোট স্বপ্ন আর জীবনের নীরব সংগ্রামও তুলে ধরত। তার প্রতিটি ছবির পেছনে একটি করে গল্প থাকত।
বছর কয়েক পরে তার প্রথম প্রদর্শনী হলো। প্রবেশদ্বারের কাছে ঝোলানো ছিল সেই পুরোনো ছবিটি—‘আলো ভাগ করলে কমে না’। ছবিটির নিচে তৃষা নিজের হাতে লিখেছিল, “কখনও কখনও একটি ছোট্ট সাহস অন্য অনেক মানুষের পথ আলোকিত করে।”
আর তার ব্যক্তিগত ডায়েরির প্রথম পাতায় আজও লেখা ছিল মায়ের সেই সাতটি শব্দ।
শিক্ষা: নিজের প্রতিভাকে ভয়ে বা অন্যের মতামতের চাপে লুকিয়ে রাখা উচিত নয়। আন্তরিকভাবে নিজের কাজ প্রকাশ করলে তা শুধু নিজের জীবনেই নয়, অন্যের জীবনেও নতুন আশা জাগাতে পারে।












Leave a Reply