খাসির মাংস ১০০০, দুর্গা ছাতু ১৫০০! হাতির আতঙ্কে আকাশছোঁয়া জঙ্গলমহলের বুনো ছাতুর দাম।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- জঙ্গলমহলের জঙ্গলে এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে হাতির দল। একদিকে হাতির আতঙ্কে গভীর জঙ্গলে যেতে ভয় পাচ্ছেন বহু গ্রামবাসী, অন্যদিকে বর্ষার শেষভাগে জঙ্গলে ফুটতে শুরু করেছে জঙ্গলমহলের অন্যতম পরিচিত বুনো ছাতু—দুর্গা ছাতু বা কাড়াঙ ছাতু। হাতির উপস্থিতির কারণে জঙ্গল থেকে ছাতু সংগ্রহে ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে কমেছে আমদানি, আর তার জেরে বাজারে চড়েছে দুর্গা ছাতুর দাম। কোথাও কোথাও সেই দাম ছাপিয়ে গিয়েছে খাসির মাংসের দামকেও।
মেদিনীপুর শহর-সহ জেলার বিভিন্ন বাজারে এখন দুর্গা ছাতুর পসরা নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। দাম তুলনামূলক বেশি হলেও ছাতুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। দরদাম করে অনেকেই সামান্য পরিমাণে হলেও কিনছেন মরশুমি এই খাবার।
বর্তমানে খাসির মাংসের দাম কেজি প্রতি প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। সেখানে কলি অবস্থায়, অর্থাৎ পুরোপুরি না ফোটা দুর্গা ছাতুর দাম উঠছে কেজি প্রতি প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। তবে ছাতু ফুটে যাওয়ার পর তার দাম কিছুটা কমে দাঁড়াচ্ছে কেজি প্রতি প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা।
মেদিনীপুর শহরের কলেজ স্কয়ারে ছাতুর পসরা নিয়ে বসেছেন রবি রানা। তাঁর কথায়, “হাতির জন্যই ছাতুর দাম বেড়েছে। কলি ছাতু ১০০ টাকা শ এবং ফোটা ছাতু ৫০ টাকা শ-তে বিক্রি হচ্ছে। দাম বাড়লেও মানুষ কিন্তু কিনছে। খাসির মাংস রোজ পাওয়া যাবে, ছাতু তো আর রোজ পাওয়া যাবে না।”
আরেক বিক্রেতা সবিতা মাহাতো জানান, বছরের এই সময়ে তিনি প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ কেজি ছাতু বিক্রি করেন। তাঁর কথায়, “গভীর জঙ্গলের ভিতরে ঢোকা এখন রিস্কের ব্যাপার। সাপ রয়েছে, হাতি রয়েছে। মানুষ তো জঙ্গলে যেতে চাইছে না। আগের মতো আর এত আমদানি হচ্ছে না। পাইকারি কিনতে গেলেও সেখানেই অনেক দাম দিতে হচ্ছে।” বিক্রেতা মালতি মাহাতো বলেন, “কলি ছাতু দেড় হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। গভীর জঙ্গলে হাতির জন্য লোক যেতে পারছে না। ছেলেরা যায়। মেয়েরা তো জঙ্গলে ঢুকতে পারে না, জঙ্গলে হাতির সামনে পড়ে গেলে মেয়েরা ছুটতে পারবে না।”
অন্যদিকে ছাতু বিক্রেতা দীপক মাহাতোর বক্তব্য, “জঙ্গলের যেদিকে হাতি নেই, সেই দিকে গিয়েই ছাতু সংগ্রহ করতে হচ্ছে।”
পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলের বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে হাতির আনাগোনা রয়েছে। বিশেষ করে মেদিনীপুর সদর, গড়বেতা, শালবনী ও গোয়ালতোড় এলাকার বিভিন্ন জঙ্গলে হাতির দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। চাঁদড়া বন বিভাগের রেঞ্জ আধিকারিক লক্ষ্মীকান্ত মাহাতোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু চাঁদড়া রেঞ্জ এলাকাতেই বর্তমানে প্রায় ১১৬টি হাতি রয়েছে। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২০টি বাচ্চা হাতি। চাঁদড়া রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি হাতি রয়েছে গাডড়ার জঙ্গলে—প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি। আমাঝরনা জঙ্গলে রয়েছে ৩০ থেকে ৩৫টি, চাউলকুড়ার জঙ্গলে প্রায় ৩০টি এবং শুকনাখালির জঙ্গলে রয়েছে ১৫ থেকে ২০টি হাতি। খাবারের সন্ধানে হাতির দল জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়েও ঢুকে পড়ছে। এই সময়েই এলাকার কৃষকেরা নতুন করে ধান রোপণের কাজ শেষ করেছেন। ফলে ধানের জমিতে হাতির হানা বাড়ছে। হাতির দল ধান খেয়ে ফেলছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে জমির উপর দিয়ে চলাচলের সময় পায়ে মাড়িয়ে সদ্য রোপণ করা ধান নষ্ট করছে। বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, চাঁদড়া রেঞ্জ এলাকাতেই গত কয়েক দিনে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ বিঘা জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন কৃষক।
হাতির আতঙ্কের মধ্যেই শুরু হয়েছে দুর্গা ছাতুর মরশুম। সাধারণত বর্ষার শেষভাগ থেকে শরতের শুরুতে, অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এই ছাতুর দেখা মেলে। পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলাঞ্চলে শালগাছের গোড়ায় ভেজা মাটিতে দুর্গা ছাতু জন্মাতে দেখা যায়। এছাড়াও ফাঁকা মাঠ, ঝোপঝাড় ও অন্যান্য স্যাঁতসেঁতে জায়গাতেও এই ছাতু পাওয়া যায়।
গ্রামবাসীদের একাংশের কাছে দুর্গা ছাতু শুধু খাবার নয়, মরশুমি আয়েরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বর্ষার শেষে জঙ্গল থেকে ছাতু সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে বহু পরিবার বাড়তি আয় করেন। কিন্তু এবার জঙ্গলে হাতির উপস্থিতি সেই সংগ্রহের পথ কঠিন করে তুলেছে। চাঁদড়া রেঞ্জের বন আধিকারিক লক্ষ্মীকান্ত মাহাতো বলেন, যেসব জঙ্গলে হাতির অবস্থান রয়েছে, সেই এলাকার গ্রামবাসীদের বন দফতরের পক্ষ থেকে নিয়মিত সতর্ক করা হচ্ছে। হাতি থাকা জঙ্গলে ছাতু, পাতা কিংবা শুকনো কাঠ সংগ্রহ করতে গভীরে না যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি গরু, ছাগল-সহ গবাদি পশু নিয়েও জঙ্গলের গভীরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।
তবে রুজির টানে এখনও কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গলে ঢুকছেন। কেউ ছাতু সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ পাতা ও শুকনো কাঠ সংগ্রহ করতে যাচ্ছেন। ফলে হাতির সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, ইতিমধ্যেই ছাতু সংগ্রহ করতে গিয়ে হাতির সামনে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জঙ্গলমহলে। একদিকে হাতির আতঙ্কে জঙ্গলে মানুষের যাতায়াত কমেছে, অন্যদিকে সেই জঙ্গল থেকেই কমেছে মরশুমি দুর্গা ছাতুর জোগান। চাহিদা থাকলেও বাজারে পর্যাপ্ত ছাতু আসছে না। আর জোগান কম থাকায় কলি অবস্থার দুর্গা ছাতুর দাম পৌঁছে গিয়েছে কেজি প্রতি ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায়। ফলে জঙ্গলমহলের বাজারে এখন দুর্গা ছাতুর দামই হয়ে উঠেছে রীতিমতো চমকের বিষয়—কোথাও কোথাও যা খাসির মাংসের দামকেও টেক্কা দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *