ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল কিছু মানুষের কঠোর পরিশ্রম ও লড়াই, যার ফলেই ব্রিটিশদের থেকে ভারত সৃঙ্খল মুক্ত হতে পেরেছভাপেরেছিল। ভারত উপমহাদেশের বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদ বিরোধী যে সশস্ত্র বিপ্লববাদী লড়াই-সংগ্রাম সংগঠিত হয় এবং যার ধারাবাহিকতায় ভারত স্বাধীন হয়, তার মূলে যে সকল বিপ্লবীর নাম সর্বজন স্বীকৃত তাঁদের মধ্যে স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী ছিলেন একজন অন্যতম বীর ও নির্ভীক বিপ্লবী। স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এক উল্লেখযোগ্য নাম, যিনি দেশমতৃকার শৃঙ্খল মুক্তির জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ রূপে।
স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী বিংশ শতকের সূচনায় ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে যে সমস্ত ধর্মীয় নেতা বিপ্লবকর্মে অংশগ্রহণ করেছিলেন,তাঁদের অন্যতম ছিলেন।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন————
সতীশ চন্দ্র ওরফে স্বামী প্রজ্ঞানন্দ সরস্বতী ১৮৮৭ সালের ১২ই আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের পটুয়াখালী জেলার গলাচিপায় পিতার কর্মস্থলে জন্মগ্রহণ করেন, বর্তমানে বাংলাদেশ। বাবা ষষ্ঠীচরণ মুখোপাধ্যায় সেখানে কনস্টেবল ছিলেন। তবে পৈতৃক বাড়ি ছিল বরিশাল জেলার উজিরপুরে। ১৯০১ সালে, তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ঢাকায় অধ্যয়ন করেন।
কর্মজীবন ও বিপ্লবী ক্রিয়াকলাপ——–
নিজ গ্রামের উজিরপুর স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলেও দুই বছর পর তিনি বিচ্ছিন্নতা বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। এরপর বরিশালে আসেন। তিনি মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত প্রতিষ্ঠিত ব্রজমোহন ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা করতেন। অশ্বিনী কুমার দত্ত স্বদেশবান্ধব সমিতির সহ-সম্পাদক হন যা তিনি স্বদেশী আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই সমিতির সম্পাদক ছিলেন রসায়নের অধ্যাপক সতীশ চ্যাটার্জি। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে সতীশ চন্দ্রের প্রচেষ্টায় বরিশালে যুগান্তর বিপ্লবী দলের একটি ঘাঁটি তৈরি হয়। তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে পুরোপুরি যুক্ত হন। 1908 সালে, যখন অশ্বিনীকুমার এবং সতীশ চট্টোপাধ্যায় বাংলার নয়জন নেতাকে ১৮১৮ সালের ৩ ধারায় ব্রিটিশ শাসকদের দ্বারা বন্দী করা হয়, তখন স্বদেশ বান্ধব সমিতির দেড় শতাধিক শাখার ব্যবস্থাপনা তার উপর পড়ে। কিন্তু ১৯০৯ সালে সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে অবৈধ ঘোষণা করে। তারপর তিনি ব্রজমোহন কলেজের কাছে শঙ্কর মঠ এবং ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই মঠের মাধ্যমে যুগান্তর দলের কাজ চালিয়ে যান। প্রকাশ্যে তাঁর আদর্শ ছিল বেদান্তের প্রচার। এই মঠে যেমন বিপ্লবীরা নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছিলেন, তেমনি সতীশচন্দ্রও এই মঠ থেকে অনেক তরুণ বিপ্লবী তৈরি করেছিলেন। অগ্নি যুগের আরেক বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ তাকে এই মঠ নির্মাণে এবং ব্রিটিশবিরোধী কার্যকলাপ পরিচালনায় বিশেষ সাহায্য করেন। যাইহোক, ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি কাশী ভ্রমণ করেন এবং সেখানেও একটি বিপ্লবী ঘাঁটি স্থাপন করেন। এর ভিত্তিতে তিনি বিপ্লবী রাসবিহারী বসু এবং শচীন্দ্রনাথ সান্যালের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। সংস্কতগ্য পণ্ডিতদের সাথে সমানভাবে আলোচনা ও বক্তৃতা করতেন।
অবশেষে, ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে, তিনি গয়াধামে শ্রী শঙ্করানন্দ সরস্বতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং স্বামী প্রজ্ঞানন্দ সরস্বতী নামে পরিচিত হন। তবে ১৯১৫ সালে কলকাতায় অধ্যাপক সতীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে থাকার সময় তিনি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময় করতেন। এখানে যোগেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর শিষ্য হন। বিপ্লবী নেতারা কলকাতা ও বরিশালে তার পরামর্শ চেয়েছিলেন। কাশীতেও তাঁর জনপ্রিয়তা ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। ১৯১৬ সালে, ব্রিটিশ সরকার তাকে ভারতের প্রতিরক্ষা আইনে গ্রেফতার করে এবং তাকে স্বগ্রামে রাখে। পরে শঙ্কর নিজেই মঠে বসবাসের অনুমতি পান। এই সময় বিপ্লবী নেতা যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় ও নলিনী কর তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে বরিশালে আসতেন। এসব ভালোভাবে দেখতে না পেয়ে সরকার তাকে মেদিনীপুরের মহিষাদলে রাখে। তবে শুধু বিপ্লবীরাই নন, গ্রামের সাধারণ মানুষ, সরকারি কর্মচারী এমনকি মহিষাদলের রাজাও ছিলেন তাঁর ভক্ত।
স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেগুলি হল -বেদান্ত দর্শনের ইতিহাস, রাজনীতি, কর্মতত্ত্ব, সবলতা ও দুর্বলতা।
স্মৃতিরক্ষা——-
স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতীর অনুগামীরা কলকাতায় তার নামে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে সরস্বতী লাইব্রেরী এবং শৈলেন্দ্রনাথ গুহরায় ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে সরস্বতী প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। তার আর এক শিষ্য যোগেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে হাওড়ার শিবপুরে শিবপুর শ্রীমৎ স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
মৃত্যু—-
মহিষাদলের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। এরপর ১৯২০ সালে মুক্তি পান। কিন্তু মহিষাদলের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তিনি পছন্দ করেন এবং মহিষাদলে ফিরে আসেন। কিন্তু ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি কলকাতায় তাঁর শিষ্য যোগেশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে আসেন এবং ১৯২১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মৃতদেহ বরিশালে নিয়ে শঙ্কর মঠে সমাহিত করা হয়।
।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।












Leave a Reply