চৈতন্য মহাপ্রভুর শিষ্য মহান বৈষ্ণব আচার্য, ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৪ সালে পুরীতে ভক্তিবিনোদ ঠাকুর (কেদারনাথ দত্ত) এবং ভগবতী দেবীর পুত্র হিসাবে জন্মগ্রহণ করেন। কৃষ্ণ গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের আচার্য বাবার কাছ থেকে ভক্তি লাভ করেন। ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর স্বভাবতই একজন অত্যন্ত উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি কোন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ছিলেন একজন গৌড়ীয় বৈষ্ণব হিন্দু আধ্যাত্মিক গুরু, আচার্য (দার্শনিক শিক্ষক) এবং বিংশ শতাব্দীর ভারতে পুনরুজ্জীবনবাদী এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম ও গৌড়ীয় মঠের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর আসল নাম “বিমলা প্রসাদ দত্ত”। তিনি বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচার করেছিলেন। তিনি জাতপাত ও অ-ব্যক্তিবাদের প্রভাবের বিরুদ্ধে জোরালো প্রচারণা চালান। তিনি পণ্ডিত, শিক্ষক এবং অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাত করে এবং ১০৮ টি কাজ এবং বই লিখে জ্ঞান হিসাবে কৃষ্ণভাবনার উচ্চ মূল্যের জন্য প্রচেষ্টা করেছিলেন। তিনি ভারতের অভ্যন্তরে এবং বাইরে ৬৪ টি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, যা গৌড়ীয় মঠ নামে পরিচিত।

শ্রীশ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদের উদ্ধৃতি—-
১. শিক্ষাষ্টকমে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা – ‘পরম বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণসংকীর্তনম্’ গৌড়ীয় মঠের একমাত্র নীতিবাক্য।
২. পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একমাত্র ভোক্তা। প্রত্যেকে এবং সবকিছুই তাঁর ভোগ্যবস্তু।
৩. যে পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করেন না, সে অজ্ঞ এবং আত্মহতা।
৪. সহ্য করার শিক্ষা লাভ করা মঠে অবস্থানকৃত ব্যক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
৫. রুপানুগ ভক্তগণ তাঁদের নিজ শক্তিমত্তায় নির্ভর করার পরিবর্তে আদি উৎসকে সব প্রশংসা নিবেদন করেন।
৬. যারা হরেক রকম (পাঁচমিশালী) ধর্মীয় আচরণবিধির অনুষ্ঠান করে, তারা পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি সেবা অনুষ্ঠান করতে পারে না।
৭. একটি অভীষ্ট লক্ষ্যে একত্রিত হও এবং শ্রীহরির সেবা সম্পাদন কর।
৮. যেখানে শ্রীহরি সম্পর্কিত আলোচনা হয়, সেটি তীর্থস্থানে পরিণত হয়।
৯. আমরা পুণ্যবান বা পাপী অথবা বিদ্বান বা মূর্খ নই, আমরা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির পদরেণুর বাহক এবং আমরা ‘কীর্তনিয়া সদা হরিঃ’ মন্ত্রে দীক্ষিত।
১০. আমার উপদেশ হচ্ছে – অন্যদের সমালোচনা করো না। নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করো।
১১. আমাদের পরম দায়িত্ব হচ্ছে ব্রজবাসীদের সেবা করা যারা শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরা যাত্রায় ব্যথিত হয়েছিলেন।
১২. একজন শুদ্ধ ভক্ত জানেন যে প্রত্যেকেই আধ্যাত্মিক গুরু, যার ফলে একজন শুদ্ধভক্ত জগদ্গুরু হতে পারেন।
১৩. যদি আমরা সত্য প্রকৃষ্টতার পথ অনুসরণ করতে চাই, মানুষের অগণিত মতামতকে আমাদের বর্জন করতে হবে এবং শুধুমাত্র বেদবাণী শ্রবণ করতে হবে।
১৪. মঙ্গলকর যেকোন কিছুই আকাঙ্ক্ষিত।
১৫. একজন অন্তরঙ্গ ভক্তের শ্রীল রূপ গোস্বামীর অনুসারীদের সেবা করা ব্যতীত অন্য কোনো বাসনা থাকে না।
১৬. শ্রবণ ব্যতীত চিন্ময় সম্বন্ধের অন্য আর উপায় নেই।
১৭. যত শীঘ্র আমরা রক্ষাকর্তার আশ্রয় হারাব, আমাদের চারদিকের সবকিছু আমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং আমাদের আক্রমণ করবে। তত্ত্বদ্রষ্টা সাধু কর্তৃক উচ্চারিত কৃষ্ণ-সম্বন্ধীয় আলোচনাই একমাত্র রক্ষক।
১৮. একজন চাটুকার কখনই একজন গুরু বা প্রচারক হতে পারে না।
১৯. প্রতারক হওয়ার চেয়ে পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ প্রভৃতি লক্ষ প্রজাতিতে অবস্থান করা শ্রেয়। যে প্রতারণা থেকে মুক্ত, তিনি মঙ্গল লাভ করেন।

২০. বৈষ্ণবত্ব সরলতার আরেক নাম। পরমহংস বৈষ্ণবদের সেবকরা সরল; সেই কারণে তাঁরা শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ।
২১. কৃপালু ব্যক্তিদের একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে অধঃপতিত জীবদের পরিবর্তন করা। যদি তুমি অন্তত একজন ব্যক্তিকে মহামায়ার প্রবল প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পার, সেটি লক্ষ হাসপাতাল তৈরির থেকে অধিক মানবহিতৈষী হবে।
২৫. আমাদের প্রধান রোগ হচ্ছে কৃষ্ণ-সম্বন্ধীয় নয় এমন বস্তু সংগ্রহ করা।
২৬. আমরা কাঠ বা পাথরের কারুশিল্পী হওয়ার জন্যে এই পৃথিবীতে আসিনি, আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপার মজুর (পিয়ন) মাত্র।
২৭. আমরা এই পৃথিবীতে বেশিদিন থাকব না। যদি আমাদের এই দেহ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির গুণমহিমা কীর্তন করে, তাহলে আমাদের এই জন্ম সার্থক হবে।
২৮. আমাদের জীবনের একমাত্র কাম্য বস্তু হচ্ছে শ্রীল রূপ গোস্বামীর চরণকমলের ধুলিকণা সংগ্রহ করা, যিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করেছেন।
২৯. এই জড় প্রকৃতি, যেটি পরম পুরুষোত্তম ভগবান বিমুখী, একটি পরীক্ষাগার। সহিষ্ণুতা, বিনম্রতা, অন্যদের মূল্যায়ন করা – এগুলি শ্রীহরির প্রতি আমাদের ভক্তির উন্নয়নের পক্ষে সহায়ক।
৩০. প্রত্যেক জন্মেই সকলে একজন বাবা ও একজন মা পেয়ে থাকে। কিন্তু অন্তিম অনুগ্রহ বা চূড়ান্ত কল্যাণের শিক্ষা কেউই লাভ করেনা।
৩১. যারা আত্মবোধশক্তির দ্বারা পরমেশ্বর ভগবানকে সেবা করার স্বাভাবিক প্রবৃত্তির উন্নয়ন করার শিক্ষালাভ করেননি, তাদের সঙ্গ যতই আনন্দদায়ক হোক না কেন, তা কামনা করা অনুচিত।
৩২. আচরণ ব্যতীত প্রচার কর্মকাণ্ডের অনুষ্ঠান ব্যতীত আর কিছুই নয়।
৩৩. যদি কেউ শুধুমাত্র পরম পুরুষোত্তম ভগবান এবং তাঁর ভক্তদের সেবা করেন, তাঁর সংসারের প্রতি আসক্তি হ্রাসপ্রাপ্ত হয়।
।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।












Leave a Reply