পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- ২৬ জুলাই— ভারতের সামরিক ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধে পাকিস্তানের অনুপ্রবেশ প্রতিহত করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মরণে দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে কার্গিল বিজয় দিবস। এই দিনটি শুধু বিজয়ের নয়, দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মবলিদান দেওয়া বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন বলেই মনে করেন কার্গিল যুদ্ধের সৈনিক, পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর শহরের সূর্যনগরের বাসিন্দা অনুপম সিংহ।
প্রতিবছরের মতো এ বছরও নিজের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং কার্গিল যুদ্ধের স্মৃতি রোমন্থনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করেন তিনি। তাঁর কাছে ২৬ জুলাই শুধুমাত্র একটি স্মরণীয় তারিখ নয়, বরং দেশের জন্য আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। ১৯৯৬ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন অনুপম সিংহ। প্রথমে তাঁর পোস্টিং হয় রাজস্থানে। ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধ শুরু হলে তাঁকে জম্মু ও কাশ্মীরে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি ৫১৩৩ এএসসি (ASC) ব্যাটালিয়ানের একজন সদস্য হিসেবে যুদ্ধকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং একাধিক সামরিক অভিযানে অংশ নেন।
আর্মির ড্রাইভার হিসেবে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যেও কর্তব্য পালন করেছেন তিনি। যুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনুপম সিংহ। তিনি জানান, একবার গুমরি থেকে খালসি যাওয়ার পথে জিরো পয়েন্টের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবল গোলাবর্ষণের মুখে পড়েন তাঁরা। পরিস্থিতি বুঝে সেনারা পাহাড়ের ঢালে আশ্রয় নিয়ে পাল্টা অবস্থান নেন। সেই সময় পাকিস্তানি বাহিনীর ছোড়া একটি গোলার স্প্লিন্টার তাঁর হাঁটুতে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে সেনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আজও সেই ক্ষতের চিহ্ন বহন করছেন তিনি। যুদ্ধের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তাঁর চোখে জল এসে যায়। তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। কখন কোথা থেকে শত্রুর গোলা এসে আঘাত হানবে, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। তবুও দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে নিজের জীবনের কথা না ভেবে প্রত্যেক সেনা সদস্য কর্তব্য পালন করেছেন। দীর্ঘ সামরিক জীবনের স্মৃতি আজও সযত্নে আগলে রেখেছেন অনুপম সিংহ। নিজের ব্যবহৃত সেনাবাহিনীর পোশাক, বিভিন্ন ব্যাজ, পুরনো ছবি ও নথিপত্র তিনি যত্ন করে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। মাঝেমধ্যেই সেগুলো হাতে নিয়ে ফিরে যান সেই গৌরবময় দিনগুলোর স্মৃতিতে। নিজের সেনা পোশাক হাতে নিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই ড্রেসটা সবাই পরতে চায়, কিন্তু সবার সেই সুযোগ হয় না। আমি এই ড্রেসটা পরার সুযোগ পেয়েছি, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। আমি ভারত মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ।” পোশাকে থাকা বিভিন্ন ব্যাজ দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, “এই ব্যাজগুলো আমার কাছে গয়নার থেকেও অনেক বেশি মূল্যবান। এগুলো শুধু ব্যাজ নয়, এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার কর্তব্য, সম্মান এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা।”
২০১৭ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন অনুপম সিংহ। বর্তমানে তিনি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের একজন অস্থায়ী কর্মী হিসেবে কর্মরত। অবসর নেওয়ার পরও দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এতটুকুও কমেনি। তাই প্রতি বছর কার্গিল বিজয় দিবসে তিনি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, বীর শহীদদের স্মরণ করেন এবং নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস জানাতে সচেষ্ট থাকেন। কার্গিল বিজয় দিবস উপলক্ষে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদনও জানান। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গের শহীদ সেনাদের পরিবারগুলির জন্য আরও বেশি সরকারি সহায়তা, আর্থিক অনুদান এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা উচিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজ্য সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে শহীদ পরিবারগুলির পাশে আরও শক্তভাবে দাঁড়াবে।
‘এই সেনা পোশাকই আমার সবচেয়ে বড় গর্ব’— কার্গিল যোদ্ধা অনুপম সিংহের আবেগঘন স্মৃতিচারণ।












Leave a Reply