মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:—- মানিকোড়া কালী’ নামে। প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন এই কালীপুজোকে ঘিরে আজও মালদার হবিবপুর ব্লকের জাজইল গ্রাম পঞ্চায়েতের মানিকোড়া এলাকায়।
একসময় গভীর জঙ্গলের মধ্যে রাতের অন্ধকারে মশালের আলোয় দেবীর আরাধনা করতে আসত ডাকাতের দল। পুজো শেষ করেই সূর্য ওঠার আগেই ফিরে যেত নিজেদের ডেরায়। সময়ের স্রোতে বদলেছে পরিস্থিতি, বদলেছে পুজোর উদ্যোক্তা। কিন্তু আজও অটুট রয়েছে সেই প্রাচীন ঐতিহ্য ও বিশ্বাস। ডাকাতদের হাতে পূজিতা সেই দেবী আজ ভক্তদের কাছে পরিচিত ‘মানিকোড়া কালী’ নামে। প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন এই কালীপুজোকে ঘিরে আজও মালদার হবিবপুর ব্লকের জাজইল গ্রাম পঞ্চায়েতের মানিকোড়া এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে নানা রোমহর্ষক লোককাহিনি।
স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, প্রায় তিনশো বছর আগে পুনর্ভবা নদী পেরিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের দিক থেকে গভীর রাতে ডাকাতের দল জঙ্গলে ঘেরা মানিকোড়ায় আসত। মশালের আলোয় জাগ্রত দেবীর পুজো দিয়ে ভোর হওয়ার আগেই তারা ফিরে যেত নিজেদের ডেরায়। সেই সময় গোটা এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। ডাকাতদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় এক জমিদার জঙ্গলের মধ্যে পরিত্যক্ত পুজোর বেদি খুঁজে পান। এরপর তাঁর উদ্যোগেই নতুন করে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। বংশপরম্পরায় জমিদার পরিবারের হাত ধরে চলতে থাকে পুজো। পরবর্তীতে জমিদারি প্রথার অবসান হলে পুজোর দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন গ্রামের বাসিন্দারা। সেই থেকে আজও গ্রামবাসীদের উদ্যোগেই হয়ে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী কালীপুজো।
তবে সময় বদলালেও বদলায়নি পুজোর বেশ কিছু প্রাচীন রীতি। ডাকাতদের আমলের ঐতিহ্য মেনে আজও মশাল জ্বালিয়ে করা হয় দেবীর আরাধনা। পুজোকে কেন্দ্র করে সাত দিন ধরে বসে বিশাল মেলা। শুধু মালদা জেলা নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত এমনকী ভিন রাজ্য থেকেও অসংখ্য ভক্ত সমাগম হয় এই মন্দিরে। ভক্তদের বিশ্বাস, মানিকোড়া কালী অত্যন্ত জাগ্রত। মায়ের কাছে মানত করলে তা পূরণ হয়। তাই বছরের পর বছর ধরে ভক্তি ও বিশ্বাসের টানে এখানে ছুটে আসেন অসংখ্য মানুষ।
পুজো কমিটির সম্পাদক গৌতম ভট্টাচার্য জানান, মানিকোড়া কালীপুজোকে ঘিরে বহু প্রাচীন গল্পকথা প্রচলিত রয়েছে। একসময় পুনর্ভবা নদীর ওপার থেকে ডাকাতের দল রাতের অন্ধকারে মায়ের পুজো দিতে আসত। পরবর্তীতে ডাকাতদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয় জমিদার জঙ্গলাকীর্ণ সেই পুজোর স্থান খুঁজে পেয়ে পুনরায় পুজো শুরু করেন। বর্তমানে গ্রামবাসীরাই এই পুজোর সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন। পুজোর সময় রাতভর চলে পাঠাবলি। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার পাঠা বলি দেওয়া হয়।
এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও এক রহস্যময় লোককথা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, পুজোর গভীর রাতে চক্ষুদান ও পাঠাবলির সময় দেবীমূর্তি নাকি কেঁপে ওঠে এবং সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেই কারণে অতীতে দেবীমূর্তিকে সোজা অবস্থায় ধরে রাখতে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার প্রচলন ছিল বলে শোনা যায়। বর্তমানে সেই রীতি না থাকলেও চক্ষুদান ও পাঠাবলির সময় দেবীর মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই বিশেষ প্রথা।
পুজোর দিন গোটা এলাকার বহু মানুষ নিরামিষ আহার করেন। গ্রামের কোনও শুভ অনুষ্ঠান শুরু করার আগেও দেবীর কাছে পুজো দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছে মানিকোড়া কালী শুধু আরাধ্য দেবী নন, তিনি এলাকার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পুজো কমিটির সহ-সম্পাদক কোষাধ্যক্ষ চিরঞ্জিত শীল জানান, শুধু বার্ষিক কালীপুজোই নয়, সারা বছর ধরেই মন্দিরে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়। আষাঢ় মাসে মায়ের থানে আষাঢ়ি পুজো অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই সময়ও বলির প্রথা রয়েছে। পাশাপাশি অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ফসল ঘরে তোলার আগে মন্দিরে নবান্ন পুজো করা হয়। মন্দিরে নবান্ন পুজো সম্পন্ন হওয়ার পরেই এলাকার মানুষ নিজেদের বাড়িতে নবান্ন উৎসব পালন করেন।
সব মিলিয়ে ডাকাতদের অন্ধকার রাতের গোপন আরাধনা থেকে আজকের সর্বজনীন ভক্তি ও বিশ্বাস—দীর্ঘ তিনশো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও স্বমহিমায় বিরাজ করছে মানিকোড়া কালী। সময় পাল্টেছে, সমাজ পাল্টেছে, কিন্তু পাল্টায়নি মাকে ঘিরে মানুষের আবেগ, ভক্তি আর অগাধ বিশ্বাস।