নিজস্ব সংবাদদাতা, দক্ষিণ দিনাজপুর-বালুরঘাট, ২৩ শে জানুয়ারি: ‘দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার, রানার/ কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার৷’ সুকান্ত ভট্টাচার্যর লেখা ‘রানার’ কবিতার লাইনগুলি যেন তার মূলমন্ত্র। খবর পড়ানোর নেশা নিয়েই বিভিন্ন এলাকা ঘুরে রোজ ১০০ কিমির বেশি পথ পাড়ি দেন মাধব চক্রবর্তী। বয়সের ভারকে কার্যত তোয়াক্কা না করেই সাইকেল চালিয়ে সংবাদপত্র পাঠের উপকারিতা বোঝান বালুরঘাটের এই ‘রানার’।
শহর লাগোয়া চকভৃগুর ডাকরা এলাকার বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী মাধববাবু যেন কবির লেখা সেই কবিতার হুবহু এক রানার৷ তবে এক্ষেত্রে চিঠির বোঝা নয়, খবরের কাগজের বোঝা হাসিমুখে বয়ে নিয়ে চলেছেন দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে৷ প্রায় ১০০ কিলোমিটার চলাচলের সঙ্গী সাইকেলটিই যেন তার আস্ত একটি বাড়ি৷ কি নেই সেখানে, হরেকরকম খবরের কাগজ থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়ার জিনিস, ছাতা, গামছা সবই রয়েছে সেই সাইকেলটিতে। কবি সুকান্তর লিখা রানারের পায়ের ঝুম ঝুম শব্দটিও যেন এখানে কিছুটা রূপ বদলে দিয়েছে সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ৷ পথ চলতি মানুষের হাতে সংবাদপত্র গুঁজে দেন তিনি। তার সঙ্গে সংবাদপত্র পড়ার প্রয়োজনীয়তা মানুষকে ধরে তিনি বোঝান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সময়কালীন সময়ে ওপার বাংলা থেকে এপারে চলে এসে আশ্রয় নেন বালুরঘাটের ভূষিলাতে৷ পরে মাধববাবুর ঠিকানা বদলে যায় ডাকরায়৷ ওপারেও পেপার বিক্রি করতেন তিনি৷ তবে তা পেশা নয়, ছিল নেশা৷ এপারেও যেন সেই নেশায় ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে বালুরঘাট থেকে বোল্লা অবধি বিভিন্ন গ্রামে সাইকেলে ঘুরে ঘুরে রোজ বিলি করেন প্রায় ২০০ পেপার৷ সময়ের ফাঁকে নিজেও একসময় সবগুলো পেপারেই চোখ বুলিয়ে নেন৷ জীবন সঙ্গী ১৭ বছর আগে গত হলেও ভেঙে পড়েননি তিনি। পেপার বিলির দায় যে উনি মাথা পেতে নিয়েছেন৷ ‘রোজ পেপার না পড়লে পাঠকের জ্ঞানের পরিধি বাড়বে কীভাবে?’ এমন ভাবনা থেকেই বয়সকে উপেক্ষা করে দুর্বার গতিতে রোজ ছুটে বেড়ান তিনি। যাকে দেখে শুধু পড়শিরাই নয়, অবাক হন অল্প বয়সী সহকর্মীরাও।
মাধব চক্রবর্তী জানান, ‘এটাই জীবনের একমাত্র নেশা। শুধু মানুষকে খবর পড়ানোর ভাবনা থেকেই সকাল থেকে রাত অবধি ছুটে বেড়াই গ্রাম গ্রামাঞ্চলে। কিন্তু এখনও বার্ধক্য ভাতা জোটেনি, এটাই দুঃখের।’
সহকর্মী মাধব মৈত্র বলেন, ‘৬৫ বছরের একজন সহকর্মীর এমন উদ্দীপনা উজ্জীবিত করে।’












Leave a Reply