আঁতলায় সেপটিক ট্যাঙ্কে চারজনের মৃত্যু, উদ্ধার করতে গিয়ে অসুস্থ আরও এক যুবক।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:-একজনকে বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লেন একে একে। শেষ পর্যন্ত সেপটিক ট্যাঙ্কের ভিতরে প্রাণ হারালেন এক মহিলা-সহ চারজন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের মোহনপুর থানার আঁতলা এলাকায়। মৃতদের মধ্যে তিনজন একই পরিবারের সদস্য বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে, ট্যাঙ্কের ভিতরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আরও এক প্রতিবেশী যুবক। তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলের এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলে মোহনপুর থানার অন্তর্গত আঁতলা এলাকার একটি বাড়িতে সেপটিক ট্যাঙ্কের কাজ চলছিল। কাজের প্রয়োজনেই প্রথমে এক ব্যক্তি ট্যাঙ্কের ভিতরে নামেন। কিন্তু ট্যাঙ্কের ভিতরে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জানা গিয়েছে। আচমকা তাঁর এমন পরিস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসার জন্য তৎপরতা শুরু হয়।
কিন্তু বিপদের গভীরতা বুঝে ওঠার আগেই ঘটে যায় আরও বড় বিপত্তি। ভিতরে আটকে পড়া ব্যক্তিকে বাঁচানোর তাগিদে ট্যাঙ্কের ভিতরে নামেন তাঁর বোন-সহ আরও দু’জন যুবক। উদ্দেশ্য ছিল, যেভাবেই হোক প্রিয়জনকে উদ্ধার করে নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসা। কিন্তু যাঁকে বাঁচাতে তাঁরা এগিয়ে গিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই উদ্ধার প্রচেষ্টাই তাঁদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
অভিযোগ, ট্যাঙ্কের ভিতরে প্রবেশ করার পর একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন আরও তিনজন। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। স্থানীয়দের দাবি, বদ্ধ ট্যাঙ্কের ভিতরে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বা ক্ষতিকর গ্যাসের প্রভাবে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। শেষ পর্যন্ত চারজনেরই মৃত্যু হয় বলে জানা গিয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
এই দিকে, ট্যাঙ্কের ভিতরে একের পর এক ব্যক্তির অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন এক প্রতিবেশী যুবক। বিপদের কথা চিন্তা না করেই তিনি উদ্ধারের চেষ্টা করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। কিন্তু উদ্ধার করতে গিয়ে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠায় স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে মোহনপুরের বাগদা গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যান। বর্তমানে সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় মোহনপুর থানার পুলিশ। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, কী পরিস্থিতিতে একের পর এক ব্যক্তি সেপটিক ট্যাঙ্কের ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং ট্যাঙ্কের ভিতরে ঠিক কী ধরনের বিপদ তৈরি হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বদ্ধ জায়গায় অক্সিজেনের ঘাটতি কিংবা বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। একটি দুর্ঘটনা, আর তাতেই শেষ হয়ে গেল চারটি প্রাণ!
এই মর্মান্তিক ঘটনার সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দিক হল, একজনকে বাঁচানোর জন্যই একে একে বিপদের মুখে এগিয়ে গিয়েছিলেন অন্যরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাউকেই আর নিরাপদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হল না। মৃতদের মধ্যে তিনজন একই পরিবারের সদস্য হওয়ায় শোকের মাত্রা আরও বেড়েছে। একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে হারিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছেন তাঁদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতরা। গোটা এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের আবহ।
মোহনপুরের আঁতলার এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিল সেপটিক ট্যাঙ্কের মতো বদ্ধ জায়গায় কাজ করার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনে চলার গুরুত্ব। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপটিক ট্যাঙ্কের ভিতরে অক্সিজেনের অভাব এবং হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি প্রাণঘাতী হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভিতরে প্রবেশ করার আগে বিপদের মাত্রা বোঝা সম্ভব হয় না। ফলে একজন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে উদ্ধারের জন্য কোনওরকম সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া অন্য কেউ ভিতরে প্রবেশ করলে বিপদ আরও বাড়তে পারে।
তাই সেপটিক ট্যাঙ্ক বা অন্য কোনও বদ্ধ জায়গায় প্রবেশের আগে প্রশিক্ষিত কর্মীর সাহায্য নেওয়া, গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা, পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও উপযুক্ত সুরক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ভিতরে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সরাসরি ভিতরে নেমে পড়াও বিপজ্জনক হতে পারে। তবে আঁতলার এই দুর্ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আদৌ নেওয়া হয়েছিল কি না, ট্যাঙ্কের ভিতরে কী ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল এবং কীভাবে একের পর এক চারজনের মৃত্যু হল, সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা।
আপাতত পুলিশি তদন্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যদিকে, একই পরিবারের তিনজন-সহ মোট চারজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা আঁতলা এলাকা। একজনকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা শেষ পর্যন্ত চারটি প্রাণ কেড়ে নিল—মোহনপুরের এই ঘটনা দীর্ঘদিন মনে থাকবে এলাকাবাসীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *