নিজস্ব প্রতিনিধি, ডুমুরগেড়িয়া: ভরদুপুরে আচমকাই এক ভয়াবহ এবং বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য ছড়াল নয়াবসতের ডুমুরগেড়িয়া এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এদিন দুপুরের দিকে যখন সাধারণ মানুষ ঘরের কাজকর্ম শেষ করে বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই একটি বন্ধ বসত বাড়ি থেকে প্রথম গলগল করে কালো ধোঁয়া বেরোতে দেখেন প্রতিবেশীরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, গ্রীষ্মের চড়া রোদ আর বাতাসের তীব্র গতিবেগের কারণে সেই আগুন অত্যন্ত দ্রুত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা সংলগ্ন চারপাশের বেশ কয়েকটি ঘরবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে এবং এলাকাটি কার্যত এক নরককুণ্ডে পরিণত হয়।
আগুনের শিখা আকাশছোঁয়া হয়ে উঠতেই শুরুতে স্থানীয় বাসিন্দারাই এলাকা জুড়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করে সবাইকে সতর্ক করতে শুরু করেন। আগুনের গ্রাস থেকে বাঁচতে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় আবালবৃদ্ধবনিতার মধ্যে। পরিস্থিতি দ্রুত হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে, স্থানীয় যুবকেরা এবং প্রতিবেশীরা নিজস্ব উদ্যোগে বিপর্যয় সামলানোর চেষ্টা চালান। তাঁরা আশেপাশের কুয়ো, টিউবওয়েল এবং পুকুর থেকে বালতি বালতি জল এনে আগুনের ওপর ঢালতে থাকেন। একই সাথে পাশের একটি নির্মাণকাজ থেকে বস্তা ভরে বালি এনেও তা নেভানোর মরিয়া চেষ্টা চালানো হয়।
কিন্তু আগুনের তীব্রতা ও উত্তাপ এতটাই বেশি ছিল যে সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি হাতে তা নিয়ন্ত্রণে আনা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। বিশালাকার কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা আকাশ, যার ফলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় অনেকের। চারপাশে তৈরি হয় চরম আতঙ্ক, কান্না আর হুড়োহুড়ি। আগুনের গতি এতই দ্রুত ছিল যে, আতঙ্কিত বাসিন্দাদের অনেকেই ঘর থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, টাকা-পয়সা কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র বের করার সামান্য সুযোগটুকুও পাননি। চোখের সামনে নিজেদের সারাজীবনের উপার্জনকে ছাই হয়ে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়েই কালবিলম্ব না করে অতি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দমকলের একটি ইঞ্জিন। ডুমুরগেড়িয়া এলাকাটি অত্যন্ত ঘিঞ্জি এবং এখানকার রাস্তাগুলি বেশ সংকীর্ণ হওয়ায় প্রাথমিক অবস্থায় দমকলের বড় গাড়িটি ভেতরে ঢোকাতে চালক ও কর্মীদের কিছুটা বেগ পেতে হয়। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সক্রিয় এবং তাৎক্ষণিক সহায়তায় বিকল্প রাস্তা দিয়ে দমকলকর্মীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। এলাকার ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দমকলকর্মীদের নিরলস ও পেশাদারী প্রচেষ্টায় আগুন চারপাশের অন্যান্য বাড়িতে আরও ছড়িয়ে পড়া আটকানো সম্ভব হয়েছে। পাইপের মাধ্যমে দূরবর্তী জলের উৎস থেকে জল এনে অবিরাম স্প্রে করা হতে থাকে জ্বলন্ত ঘরগুলিতে। দমকলের পাশাপাশি স্থানীয় যুবকেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জল সরবরাহের কাজে হাত লাগান, যার ফলে পরিস্থিতি আরও বড় কোনো বিপর্যয়ের দিকে মোড় নেয়নি।
ঠিক কী থেকে এই বিধ্বংসী আগুনের সূত্রপাত, তা নিয়ে এখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে দমকল বাহিনী এবং পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, কোনো একটি বাড়ির ভেতরের বৈদ্যুতিক লাইনে শর্ট সার্কিট হওয়ার কারণেই এই বিপত্তি ঘটেছে। আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার লিক করে বা রান্নার উনুন থেকেও আগুন ছড়াতে পারে। দমকলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের মতে, আগুন সম্পূর্ণ পকেট স্তরে নিয়ন্ত্রণে আসার পরেই ফরেনসিক ও অন্যান্য বিভাগীয় তদন্ত করে এর প্রকৃত এবং সঠিক কারণটি জানা সম্ভব হবে। স্বস্তির বিষয় এই যে, ঘটনার সময় বাসিন্দারা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে আসায় এখনও পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা গুরুতর হতাহতের খবর মেলেনি। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নেহাত কম নয়। প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গেছে, অন্ততপক্ষে চার থেকে পাঁচটি বাড়ি আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গেছে। ঘরের আসবাবপত্র, জামাকাপড়, খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ লক্ষাধিক টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ও ক্ষতিগ্রস্তরা।
এই আকস্মিক বিপর্যয়ের খবর পেয়েই স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রতিনিধি এবং ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকেরা দ্রুত দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। তাঁরা দমকলের কাজের তদারকি করার পাশাপাশি সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলির সাথে কথা বলেন এবং তাঁদের সান্ত্বনা দেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য আপৎকালীন খাবার, পানীয় জল এবং অস্থায়ী ত্রিপল বা ছাউনির ব্যবস্থা করার তৎপরতা শুরু হয়েছে।
এলাকার সমাজকর্মীরা ও বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন, যেহেতু এই পরিবারগুলি মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে, তাই সরকারি তহবিল থেকে যাতে দ্রুত আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং স্থায়ী ঘর তৈরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। বর্তমানে আগুন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও, এলাকা জুড়ে এখনও এক থমথমে পরিস্থিতি ও পোড়া গন্ধ বিরাজ করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সব ধরনের সরকারি সাহায্য দেওয়া হবে।












Leave a Reply